‘সুস্থ বাঘের চেয়ে আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর’, আইপ্যাক কান্ডে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন মমতা

January 9, 2026 | 4 min read

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৮:০৫: আইপ্যাক (I-PAC) কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে ইডি (ED) তল্লাশির প্রতিবাদে রাজপথে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার যাদবপুর এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি। মিছিল শেষে হাজরার মঞ্চ থেকে কেন্দ্র সরকার, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তাঁর সাফ হুঁশিয়ারি, “সুস্থ বাঘের চেয়ে আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর।” মিছিল শেষে তিনি বলেন, “আমাদের পরবর্তী ডেস্টিনেশন নির্বাচন কমিশন। কলকাতা থেকে দিল্লি, খেলা হবে।”

এদিন মিছিল শুরু হয় যাদবপুর এইট বি বাস স্ট্যান্ড থেকে, শেষ হয় হাজরা মোড়ে। মিছিল শুরুর আগে যাদবপুরে জমায়েত হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানান। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে তৃণমূলের সর্বময়নেত্রী বলেন, “আপনাদের সমর্থন বাংলার মানুষকে বিশ্বের দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দিল্লির লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, অত্যাচার, অপমান, অসম্মান। বাংলার মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে রাস্তাই রাস্তা দেখাবে। যাদবপুরের মাটি লড়াইয়ের মাটি।”

প্রতিবাদ মিছিলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

প্রতিবাদ মিছিলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন “বাংলা জেগে উঠেছে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন।” “বুঝতেই পারলাম না কখন সাড়ে ১০ কিলোমিটার হেঁটে ফেললাম। এই হাজরাতেই সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। গতকাল মনে হচ্ছিল, আবার নতুন করে জন্মালাম। এই হাজরাতেই মার খেয়েছিলাম পর পর ডান্ডা মেরেছিল হাত থেঁতলে দিয়েছিল। অনেকবার মার খেয়েছি। সারা দেহে আঘাত নিয়েই কাজ করি।” নিজের শারীরিক অবস্থার প্রসঙ্গও টেনে আনেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি জানান, মাথায় আঘাতের পর থেকে ভোর ৪টার আগে আর ঘুমোতে পারেন না।

‘ডেটা চুরির চেষ্টা’ ও ইডি অভিযানের প্রতিবাদ

মমতা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিকভাবে পেরে না উঠে বিজেপি এখন এজেন্সিকে ব্যবহার করে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল বা ‘ডেটা’ চুরির চেষ্টা করছে। গতকাল আইপ্যাকের দপ্তরে তাঁর উপস্থিতি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, “কাল যা করেছি, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন হিসেবে করেছি। কোনও অন্যায় করিনি। তোমরা চোরের মতো আমার সমস্ত ডেটা চুরি করতে এসেছিলে। সকাল ৬টা থেকে তল্লাশি চালিয়ে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় যা করার করেছ।” তিনি আরও বলেন, “জোড়াফুলটা যদি রক্ষা না হয়, তবে মানুষের হয়ে লড়াই করব কী করে?” মমতা আরও বলেন, “তোমরা তো এসেছো সকাল ৬টায়, আমি গেছি ১২টায়। এতক্ষণে তো সব নিয়ে চলে গেছো। আমি খবরটা শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম,এসেছে কিছু জানতে বা দেখতে। তারপর খেয়াল হল, প্রতীককে ফোন করলাম। ওর ফোন বেজে গেল, ফোন ধরল না। তখন আমার মনে হল, আমাদের দলের নথিপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে না তো? তখন আমি তড়িঘড়ি গেলাম।”

দিল্লিতে ৮ সাংসদের হেনস্তার প্রতিবাদ

দিল্লিতে ৮ সাংসদের হেনস্তার ঘটনায় মমতা তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের এমপিরা দিল্লির কুয়াশায় ভরে প্রতিবাদ করেছে। কোর্ট নিয়ে বলব না। বিচারের বাণী বিচারের কথা বলবে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, বিহার-হরিয়ানা জোর করে দখল করেছেন। এখন ভাবছেন বাংলা দখল করবেন। নামটা শুনলেই বাংলা, করে দিচ্ছে হামলা। বাংলা নামটাই সহ্য করতে পারছে না।”

নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা নিয়ে তোপ

এদিন মুখ্যমন্ত্রীর আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি কমিশনকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন। মমতা বলেন, “ভ্যানিশ কুমার সব নাম কেটে দিচ্ছে। নিজের মেয়ে-জামাইকে ডিএম বানিয়েছে। এমপি দেবের নাম তিনবার কেটে দিয়েছে। ছিঃ লজ্জা!”

জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ’ কুমার আখ্যা দিয়ে মমতা ব্যানার্জি তীব্র আক্রমণ শানালেন। তিনি বলেন, “তুমি একদিন আটকাবে, ১০০ দিন দেখিয়ে দেব। আমাকে একদিন জেলে ভরবে, আমি তোমাকে গোটা পৃথিবীর জেলে ভরব। জিএসটির টাকা তুলে নিয়ে যাও, আমাদের টাকা দাও না, আমাদের দাও। রাস্তার টাকা বন্ধ, জলের টাকা বন্ধ, জীবনের টাকা বন্ধ বসিয়েছে একজনকে, সে কে – হোম মিনিস্টারের লোক। আপত্তি নেই। ভ্যানিশ কুমার যদি ভোট ভ্যানিশ করে দেয়, তাহলে আপত্তি আছে। আপনি কি ম্যাজিশিয়ান।”

‘SIR’-এর নামে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “৯০ বছরের বৃদ্ধকে ডাকছ, লজ্জা করে না! দুকান কাটা দল। পাটি না দোপাটি। বলছে, বাংলায় রোহিঙ্গা ভর্তি, অথচ একটাও খুঁজে পায়নি।” তাঁর হুঁশিয়ারি, “নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নিলে আপনার অধিকারও আমরা কেড়ে নেব।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য নির্বাচন কমিশন। স্লোগান দেন, “বিজেপি হঠাও দেশ বাঁচাও।”

নতুন ভোটারদের বার্তা

নতুন ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। এ নিয়ে তিনি ২০০২ এর পর যারা জন্মেছেন, তাঁদের সতর্ক করে বলেন, “নতুন ভোটার ২০০২ এর পর যারা জন্মেছেন।‌ বলছে ফর্ম ৬ ফিল আপ করতে, কিন্তু ৪ নম্বর ফর্ম ফিলাপ না করলে নাম কেটে বাদ যাবে। ভ্যানিশ কুমার সব নাম কেটে দিচ্ছে। নিজের মেয়ে জামাইকে ডিএম বানিয়েছে।”

পেনড্রাইভ ফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগ

বিজেপির শীর্ষনেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ আনেন মমতা। কয়লা পাচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে তিনি বলেন, “কয়লা, বর্ডার, কাস্টমস সব দায়িত্ব কেন্দ্রের। আর বলছে কয়লার টাকা নাকি আমরা খাই!” এরপরই বিস্ফোরক দাবি করেন মমতা, “সাথে আছে বিজেপির বড় ডাকাত জগন্নাথ। জগন্নাথের থ্রুতে টাকা যায় শুভেন্দুর কাছে আর শুভেন্দুর কাছ থেকে টাকা যায় অমিত শাহর কাছে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে পেনড্রাইভটা ফাঁস করে দেব। আমি চেয়ারে আছি বলে পেনড্রাইভ বার করিনি।”

কেন্দ্রের বঞ্চনা ও প্রতিরোধের ডাক

বাংলার আবস যোজনা ও ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ফের সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “গরিব মানুষের বাড়ির টাকা, রাস্তার টাকা দাওনি। ৪ বছর আবাস যোজনাসহ বাংলার টাকা বন্ধ।” তিনি বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার জোর করে দখল করেছেন। এখন ভাবছেন বাংলা জোর করে দখল করবেন? এখানে পুতলে দিল্লিতে জন্মাবে, দিল্লিতে পুতলে বাংলায় জন্মাবে।”

বিজেপিকে হুঁশিয়ারি

বিজেপিকে উদ্দেশ্য করে মমতা ব্যানার্জি তীব্র হুঙ্কার ছুড়লেন। তিনি বলেন, “ছিঃ ধিক্কার! বাংলা জিততে এলে – নাডু নয়, জুটবে ঝাড়়ু। মার ঝাড়ু মার, ঝেটিয়ে বিদেয় কর। ভ্যানিশবাবু ১.৫ কোটি ভোট কাটার ক্ষমতা নিয়ে এসেছেন, সবার নাম কেটে ভোটে বিজেপিকে জেতাতে চান। আমাদের এখানে পুঁতলে দিল্লিতে গিয়ে জন্মাব, দিল্লিতে পুঁতলে এখানে জন্মাব। এটা বাংলার মাটি।”

বক্তব্যের শেষে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে মমতা আহ্বান জানান, “পাড়ায় পাড়ায় বিজেপির মৃত্যু ঘণ্টা বাজিয়ে দিন। মৃত ব্যক্তিদের একটা লিস্ট করে টাঙিয়ে দিন।” তিনি প্রত্যয়ের সুরে বলেন, “আগামী দিন হবে খেলা। ফাটাফাটি খেলা।”

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

ভিডিও

আরও পড়ুন

Decorative Ring
Maa Ashchen