“জীবন্ত মানুষকে মৃত দেখানো হচ্ছে, ৫৪ লক্ষ নাম বাদ”, SIR নিয়ে নবান্ন থেকে বিস্ফোরক মমতা
নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৭:২২: বাংলায় SIR-র পদ্ধতি নিয়ে ফের ক্ষোভ উগরে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। মঙ্গলবার নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে প্রায় ৫৪ লক্ষ মানুষের নাম বেআইনি ও অনৈতিকভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে গভীর চক্রান্ত দেখছেন তিনি। এই ঘটনার জন্য তিনি সরাসরি নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির আঁতাতকে দায়ী করেছেন।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “জেনুইন বা প্রকৃত ভোটারদের নাম আশা করি বাদ যাবে না।” তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, সাধারণ ও অসহায় মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “অনেক অসহায় মানুষ আছেন, সাধারণ মানুষের সাথে ৫৪ লক্ষ মানুষকে বিনা কারণে, বেআইনি ও অনৈতিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মহিলাদের টার্গেট করা হয়েছে।”
গণতন্ত্রের উৎসব বা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এটা জঘন্য ষড়যন্ত্র। নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব, কিন্তু এখানে সরকার ঠিক করে দিচ্ছে কী হবে।” তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকায় জীবন্ত মানুষকেও মৃত বলে দেখানো হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সীমারেখা পার করে যাচ্ছে। জীবন্ত মানুষকে যদি মৃত দেখানো হয়, তাঁদের ভোটাধিকার যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তবে কোনও রাজনৈতিক দল তা মেনে নিতে পারে না।”
ভোটারদের সচেতন করতে মুখ্যমন্ত্রী পরামর্শ দেন, নাম বাদ যাওয়ার শুনানির সময় যেন তাঁরা সজাগ থাকেন। তিনি বলেন, “যখন হেয়ারিং-এ ডাকবে, জিজ্ঞেস করবেন রসিদ কোথায়?” একইসাথে প্রশাসন ও আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, ভয়ের কোনও কারণ নেই, কিন্তু নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, “ইলেকশন রুলস মেনে চলা প্রশাসনের দায়িত্ব। মাইক্রো অবজার্ভাররা যদি আপনাকে কোনও ভুল অর্ডার দেন, তবে আপনি তা মানতে বাধ্য নন।”
এদিন জাতিগত শংসাপত্র বা ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিলের প্রসঙ্গেও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। বিহারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “রাজ্য সরকারের সমস্ত সার্টিফিকেট ক্যান্সেল করে দিয়েছে। তাহলে বিহারে যেটা হচ্ছে, বাংলায় হবে না কেন?”
মঙ্গলবার বাঁকুড়ার খাতড়ার সিনেমা মোড়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের সন্দেহ হয় একটি গাড়ি দেখে। গাড়িটিকে ধাওয়া করে থামাতেই বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য। প্রায় ৪ হাজার ফর্ম ৭, অর্থাৎ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনপত্র উদ্ধার হয়। সঙ্গে সঙ্গে খবর যায় থানায়। পরিস্থিতি জটিল বুঝে গাড়িতে থাকা তিনজন পালিয়ে যায়, তবে দু’জনকে আটক করে পুলিশ। জানা গিয়েছে, পাঁচজনই এলাকায় বিজেপি নেতা হিসেবে পরিচিত। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন তালডাংরা বিধানসভার বিবরদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন মণ্ডল সভানেত্রী ঝুমা ঘোষের স্বামী প্রবীর ঘোষ।
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্ধার হওয়া ফর্মের ছবি দেখিয়ে বলেন, “এই দেখুন এটা আমার কাছে এসেছে। এটা হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি। এভাবেই নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।”
এ বিষয়ে তৃণমূলের বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তারাশঙ্কর রায় বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “ভোটের আগে পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। হাজার হাজার ফর্ম ৭ আগে থেকেই পূরণ করে গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা কোনওভাবেই সাধারণ ঘটনা নয়। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে তদন্ত করা।”
রানিবাঁধের তৃণমূল বিধায়ক জোৎস্না মাণ্ডিও একই সুরে বলেন, “গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। গরিব, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার নীলনকশা স্পষ্ট। আমরা চাই, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”
মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সাধারণ ও অসহায় মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহিলারা বিয়ের পর পদবী পরিবর্তন করলে বা কেউ বাসস্থান পরিবর্তন করলে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির অজুহাতে কোটি কোটি মানুষের নাম নিয়ে ছেলেখেলা করা হচ্ছে। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।”
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেবল সাধারণ মানুষ নন, অমর্ত্য সেন, কবি জয় গোস্বামী এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম নিয়েও ভোটার তালিকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এনআরসি বা নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্কে রাজ্যে ইতিমধ্যেই অনেকে হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন, এমনকি ৪ জন আত্মঘাতী হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, “জীবন্ত মানুষদের মৃত দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কমিশনের একাংশ বিজেপির ‘দলদাস’ হিসেবে কাজ করছে। মাইক্রো অবজার্ভারদের মাধ্যমে বহিরাগতদের এনে এই ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, শুনানি বা হিয়ারিংয়ের সময় বিএলএ (বুথ লেভেল এজেন্ট)-দের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এবং নথিপত্র জমা দিলেও তার কোনও রসিদ (Receipt) দেওয়া হচ্ছে না।
ভোটের আগে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি পুলিশ ও বিডিও-দের উদ্দেশ্যে বলেন, “কোথাও বেআইনিভাবে বা গুচ্ছাকারে (Bulk) ফর্ম জমা পড়তে দেখলে বা ভোটার তালিকা নিয়ে জালিয়াতি হতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে এফআইআর করতে হবে এবং সেই কাগজ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।” মতুয়া এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “কারও দয়ায় নয়, আপনারা আপনাদের অধিকারেই এদেশের নাগরিক। ভয় পাবেন না, আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।”
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, বাংলা বা বাঙালির অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই ‘ব্ল্যাক গেম’ বা কালো জাদু তিনি সফল হতে দেবেন না। জনগণ যাতে নিজেদের নাম তালিকায় আছে কি না তা যাচাই করে দেখেন, সেই আবেদনও জানান তিনি।