‘কোচবিহার থেকে বিজেপিকে উপড়ে ফেলা সময়ের অপেক্ষা’, রণসংকল্প সভা থেকে তোপ অভিষেকের

January 13, 2026 | 5 min read

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৫:০০: উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে বিজেপিকে (BJP) উৎখাত করার ডাক দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। মঙ্গলবার কোচবিহারের ‘রণসংকল্প সভা’য় দাঁড়িয়ে বিজেপিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। এর পাশাপাশি তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, কোচবিহার থেকে বিজেপিকে উপড়ে ফেলা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। এদিনের সভাকে ‘বিজেপির বিসর্জনের শুভ সূচনা’ বলেও অভিহিত করেন তিনি।

এদিন কোচবিহারে (Cooch Behar) পৌঁছেই প্রথমে মদনমোহন মন্দিরে পুজো দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘‘কোচবিহারে আসব, মদনমোহন মন্দিরে যাব না, তা তো হয় না। ২০২৩ সালে নবজোয়ার কর্মসূচি মদনমোহন মন্দিরে পুজো দিয়ে শুরু করি। মানুষের কাছে পৌঁছোনোর লক্ষ্যে যে লড়াই, তা শুরু করেছিলাম। আজ যে উদ্দীপনা চোখে পড়েছে, তাতে কোচবিহার থেকে বিজেপিকে উপড়ে ফেলা সময়ের অপেক্ষা।’’

জনগণের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘‘এই জেলায় এসে কর্মসূচি করেছি। যে উৎসাহ লক্ষ্য করেছি, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের যে ভালবাসা পেয়েছি, মানুষ রাস্তায় যে ভাবে আশীর্বাদ করেছে, আমি জেলার কাছে চিরঋণী।’’

এদিনের সভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি নেতাদের ‘বহিরাগত জমিদার’ বলে কটাক্ষ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘বাংলার উপর যাঁরা ধারাবাহিক হামলা করে, মানুষকে নিপীড়িত করে রাখার চেষ্টা করে, বাংলার মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে ভাষা বহিরাগত জমিদাররা বোঝে, তাদের সেই ভাষায় আগামী দিনে জবাব দেবে। মানুষ প্রস্তুত।’’

বিগত বছরগুলিতে বিজেপি নেতাদের দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে অভিষেক অভিযোগ করেন, ভোট মিটলেই কোচবিহারের মানুষকে ভুলে যায় বিজেপি। তিনি বলেন, ‘‘২০১৪, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১, ২০২৪ বারবার নেতারা সভা করতে এসে প্রধানমন্ত্রী-সহ বিজেপির বড় নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নারায়ণী ব্যাটেলিয়ন, চিলা রায়ের নামে প্যারামিলিটারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পঞ্চানন বর্মার নামে লাইব্রেরি বা মদনমোহন মন্দিরকে আন্তর্জাতিক মন্দির হিসাবে ঘোষণা- কিছুই হয়নি।’’

কেন্দ্রীয় বঞ্চনার খতিান তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘‘কোচবিহার রেল স্টেশনে ২০২১ সালে স্পোর্টস হাব করবে বলে শিলান্যাস করেছিল, তাতে শ্যাওলা পড়েছে। বলা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হবে। ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে ৯ আসনের বিমান চলছিল, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে তা-ও বন্ধ হতে চলেছে।’’ পাশাপাশি অসমের ধাঁচে এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্পের ভীতি প্রদর্শন নিয়েও সরব হন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি ভোটে জেতার পরে কোচবিহারের মানুষকে এসআইআর-এর মাধ্যমে বা অসমের ফরেন ট্রাইবুনালের নোটিস পাঠিয়ে অপমানিত করেনি, তাঁদের শোষিত করেছে। অধিকারের টাকা আটকেছে।’’

কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগের মাঝেই রাজ্য সরকারের উন্নয়নের খতিান তুলে ধরেন অভিষেক। তিনি জানান, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার পথশ্রী-রাস্তাশ্রী প্রকল্পে সাড়ে তিনশো কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ৩ মাসের মধ্যে রাস্তা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।’’

এদিনের ভাষণে নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার আমার প্রশ্নের একটাও সদুত্তর দিতে পারেননি। আমি বলেছি আঙুল নামিয়ে কথা বলুন। আপনি মনোনীত, আমি নির্বাচিত।’’

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ১০ জন সাধারণ মানুষকে সশরীরে মঞ্চে হাজির করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির দলদাসে পরিণত হয়েছে এবং বেছে বেছে এ রাজ্যের জীবিত ভোটারদের ‘মৃত’ ঘোষণা করে তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছে। তাঁদের নাম পরিচয় সর্বসমক্ষে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের সামনে তথ্য উপস্থাপিত করা আমার কর্তব্য। অশ্বিনী অধিকারী, শিবানী অধিকারী, কাজিমা খাতুন, আলিমান বেওয়া, মুকুল দেব কর্মকার, মুর্শিদ আলম, আবুজার মিয়াঁ, আজিজার রহমান এবং তপন বর্মন- আপনারা সকলে এই ১০ জনকে দেখতে পাচ্ছেন তো? এঁরা প্রত্যেকেই কোচবিহারের ভূমিপুত্র, এখানে বড় হয়েছেন। কিন্তু বিজেপির দালাল নির্বাচন কমিশন আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেছেন।’’

মঞ্চে উপস্থিত ব্যক্তিদের দেখিয়ে অভিষেক জনতাকে প্রশ্ন করেন, ‘‘এই ১০ জনকে দেখে কি আপনাদের মৃত মনে হচ্ছে?’’ তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে সুকৌশলে এই সাধারণ মানুষের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে যাতে তাঁরা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের উল্লেখ করে অভিষেক মনে করিয়ে দেন, কোচবিহারে ৯টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি ৬টি জিতেছিল। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, ‘‘বিজেপিকে জেতাবেন আর অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন, এটা হতে পারে না। আগামী লড়াইয়ে এই ৬-৩ ব্যবধানকে ৯-০ করতে হবে। সমস্ত আবর্জনা উপড়ে ফেলে সাফ করতে হবে। তবেই এরা শিক্ষা পাবে।’’ তিনি আরও যোগ করেন, তৃণমূল যতদিন শক্তিশালী ছিল, দিল্লি বা মধ্যপ্রদেশ থেকে বিজেপির কোনো নেতা বাংলার মানুষের ওপর চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায়নি।

বিজেপি নেতাদের জ্ঞানের পরিধি নিয়ে কটাক্ষ করে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বলেন, ‘‘যারা ভাষা জানে না, মনীষীদের অপমান করে, তাদের কাছে আমাদের হিন্দুত্ব শিখতে হবে? অমিত শাহ বলেন রবীন্দ্রনাথ সান্যাল, কবিগুরুর জন্মস্থান বলেন শান্তিনিকেতন! সুকান্ত মজুমদার স্বামীজিকে বলেন ‘অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট’। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিল যারা, মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে, তাদের থেকে হিন্দুত্বের শংসাপত্র নেব না।’’ পঞ্চানন বর্মা বা চিলা রায়ের অবদানকে বিজেপি অস্বীকার করছে বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন।দিনহাটার প্রেমকুমার বর্মণের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, অমিত শাহের অধীনস্থ বিএসএফ নিরীহ কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর পেলেট গান চালাচ্ছে। বিএসএফ-এর অত্যাচার ও এসআইআর-এর জাঁতাকলে পড়ে মৃত ও আত্মঘাতী হওয়া চার পরিবারের প্রতিনিধিদের এদিন মঞ্চে আনা হয়। অভিষেক তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘‘এক সপ্তাহ আগে মিটিং করে শুকতাবাড়ির লোকেদের বাংলাদেশী বলা হয়েছে। আমরা বাংলায় কথা বলে যদি বাংলাদেশী হই, তবে নিশীথ প্রামাণিক বা শুভেন্দু অধিকারীরা কোন ভাষায় কথা বলেন? ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আমাদের ঐতিহ্য। দেশের রাষ্ট্রপতি এই স্লোগান দিয়ে গিয়েছেন, অমিত শাহ কোন ছাড়!’’

সবশেষে কেন্দ্রের নেতাদের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়ে অভিষেক বলেন, তৃণমূল এবার দিল্লি যাবে। কোচবিহারের মাঠের জনসমুদ্র দেখে দিল্লির নেতাদের রাতের ঘুম উড়ে যাবে। তাঁর দাবি, ‘‘বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যদি দিল্লি যায়, তবে বিজেপির নেতারা বানের জলে ভেসে যাবে।’’ কোচবিহারের এই সভা থেকে কার্যত লোকসভা নির্বাচনের সুর বেঁধে দিয়ে কর্মীদের চাঙ্গা করে গেলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

এদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন অভিষেক। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য দীপা চক্রবর্তী থেকে শুরু করে একাধিক নেতা ভোটের আগে এই প্রকল্প বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছেন। অভিষেক সাফ জানান, “বিজেপি নেতারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু যতদিন মা-মাটি-মানুষের সরকার আছে, কেউ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাবে না।”

 

বিগত নির্বাচনে কোচবিহারের ৯টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি ৬টিতে জয়ী হয়েছিল। সেই হিসাব পাল্টে দেওয়ার ডাক দিয়ে অভিষেক বলেন, “৬-৩ নয়, এবার তৃণমূলের পক্ষে ৯-০ করতে হবে। সব রাজনৈতিক আবর্জনা সাফ করতে হবে।” তিনি জানান, রাজ্য সরকার কোচবিহারের উন্নয়নের জন্য কোনো খামতি রাখছে না। পথশ্রী প্রকল্পে জেলায় ৩৫০ কোটি টাকার রাস্তা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি বিধানসভায় গড়ে ৪০ কোটি টাকার রাস্তার কাজ সম্পন্ন হবে।

বিজেপি নেতাদের জ্ঞান এবং বাংলার সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিষেক বলেন, “যাঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সান্যাল বলেন, শান্তিনিকেতনকে তাঁর জন্মস্থান মনে করেন, তাঁদের কাছে আমাদের হিন্দুত্ব শিখতে হবে?” সুকান্ত মজুমদার ও অমিত শাহের নাম উল্লেখ করে তিনি বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা এবং স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। এমনকি বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকারের কাঁটাতার তুলে দেওয়ার মন্তব্যকে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বলে অভিহিত করেন তিনি।

 

বিএসএফ-এর গুলিতে দিনহাটার প্রেমকুমার বর্মণের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে নিশীথ প্রামাণিকের সময়কালের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বিএসএফ চাষিদের পাচারকারী সন্দেহ করে মারছে। কোচবিহারের মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ বলে অপমান করা হচ্ছে।” তাঁর প্রশ্ন, “বাংলায় কথা বললে যদি আমরা বাংলাদেশি হই, তবে নিশীথ প্রামাণিক বা শুভেন্দু অধিকারীরা কোন ভাষায় কথা বলেন?” ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বাঙালির ঐতিহ্য এবং দেশের রাষ্ট্রপতিও এই স্লোগান দিয়েছেন বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

এদিনের জনসমাবেশ থেকে সরাসরি দিল্লিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে অভিষেক বলেন, “আজ মাঠের ভিড় দেখে দিল্লির নেতাদের রাতের ঘুম উড়ে যাবে। বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যদি দিল্লিতে পৌঁছায়, তবে বিজেপির নেতারা বানের জলে ভেসে যাবে।” আগামী ১০০ দিন কর্মীদের লড়াইয়ের ময়দানে থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস দিল্লির অধিকার ছিনিয়ে আনবেই।

কেন্দ্রীয় সরকার আবাস যোজনার টাকা আটকে রাখা নিয়ে সরব হয়ে অভিষেক এদিন বড় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘‘বাড়ি দেওয়ার কথা ছিল নরেন্দ্র মোদীর। তিনি দেননি। কিন্তু আমাদের সরকার কথা দিচ্ছে, আগামী দিনে রাজ্যের ১৬ লক্ষ মানুষকে বাড়ি করে দেওয়া হবে। এর মধ্যে কোচবিহার জেলারই দেড় লক্ষ মানুষ বাড়ি পাবেন।’’ তিনি কোচবিহারবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, মানুষ যে ভালোবাসা আজ দিয়েছেন, আগামী দিনে উন্নয়নের মাধ্যমেই তার ঋণ শোধ করা হবে।

শুভেন্দু-নিশীথকে আক্রমণ বিজেপি নেতাদের ‘বাংলাদেশি’ কটাক্ষের প্রতিবাদে সুর চড়িয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘শুভেন্দু, নিশীথদের উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষ আজ এখানে এসেছেন। যারা আমাদের বাংলাদেশি বলে গালি দেয়, তাদেরই বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে উৎখাত করার সময় এসেছে। ক্ষমতা থাকলে বাংলার মানুষকে স্পর্শ করে দেখান!’’

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

ভিডিও

আরও পড়ুন

Decorative Ring
Maa Ashchen