‘শুধু হারানো নয় শূন্য করতে হবে’, বীরভূমে পদ্ম উপড়ে ফেলার ডাক অভিষেকের

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৭:৩৫: কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, বাঙালির সংস্কৃতিতে আঘাত এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধের ‘ষড়যন্ত্র’-এই তিন হাতিয়ারে বীরভূমের রামপুরহাট থেকে বিজেপিকে তুলোধোনা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার ‘রণ সংকল্প সভা’ থেকে তিনি স্পষ্ট জানান, ২০২৬-এর নির্বাচনে বীরভূমের ১১টি আসনেই বিজেপিকে ‘শূন্য’ করতে হবে।
এদিন সভাস্থলে পৌঁছতে বেশ কিছুটা দেরি হয় অভিষেকের। মঞ্চে উঠেই তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর হেলিকপ্টারের অনুমতি আটকে দিয়েছিল কেন্দ্র। তিনি বলেন, “বিজেপির যা জেদ, তার ১০ গুণ জেদ আমার। আমি ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে কথা বলে ওনার হেলিকপ্টার আনিয়েছি। আমার দেরি হলেও আমি কথা দিয়েছিলাম আসব, আমি এসেছি।”
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে অভিষেক এদিন স্পষ্ট জানান, ২০২৬ সালে বীরভূমের ফলাফল হতে হবে ১১-০। উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করার চক্রান্তের অভিযোগ তোলেন। এই প্রসঙ্গে বিজেপির এক নেতার ভাইরাল অডিও ক্লিপ শুনিয়ে অভিষেক বলেন, “বিজেপি নেতারা স্বামীদের বলছেন স্ত্রীদের ঘরে বন্দি করে রাখতে, যাতে তাঁরা জোড়াফুলে ভোট না দেন। কিন্তু আমি বলছি, যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, কেউ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করতে পারবে না।”
এদিন সভার শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে সুর চড়ান অভিষেক। তিনি বলেন, “বাংলার ২ কোটি ৭৪ লক্ষ জব কার্ড হোল্ডারের টাকা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আবাসের টাকা, সর্বশিক্ষা মিশন থেকে শুরু করে জলজীবন মিশন-সব টাকা আটকে দিয়েছে কেন্দ্র। যারা গরিব মানুষকে ভাতে মারছে, এবার নির্বাচনে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বন্ধ করে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিতে হবে।” বীরভূমের ৩৬০০টি বুথ থেকেই বিজেপিকে ‘ভোকাট্টা’ করার ডাক দেন তিনি।
দলের জেলা নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অভিষেক এদিন বিজেপিরই এক রাজ্যসভা সাংসদ ও কর্মীদের একাংশের ক্ষোভকে হাতিয়ার করেন। তিনি দাবি করেন, বিজেপির নেতারাই তাঁদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ জানাচ্ছেন যে, সিউড়ি থেকে রাজারহাট–বিজেপি নেতারা বিপুল সম্পত্তি করেছেন। পাশাপাশি, বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ অনন্ত মহারাজ খোদ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বাংলাদেশি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন অভিষেক।
বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে বিজেপির জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল সাংসদ। তিনি বলেন, “অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা বলছেন বাংলা বললে জেলে পুরবেন। বিজেপির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদবী বলছেন ‘সান্নাল’! যারা কবিগুরুর জন্মস্থান জানে না, যারা স্বামী বিবেকানন্দকে ‘অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট’ বলে অপমান করে, বীরভূমের মানুষ তাদের ছেড়ে দেবে না।” শান্তিনিকেতনের ফলক থেকে কবিগুরুর নাম বাদ দেওয়া এবং বাঙালির ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিজেপির বাংলা-বিরোধী মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে অভিষেক বলেন, “৭০টি আসন পেয়েই এরা বাঙালির হেঁশেল নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ব্রিগেড চলোর নামে গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে এক চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে নিয়ে এসে নাটক করা হয়েছে। বিজেপি নেতারা ঠিক করে দিচ্ছে কে ডিমের ঝোল খাবে আর কে এগরোল। ৭০টা আসন পেয়েই যদি এরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আর ১০০ দিনের টাকা বন্ধ করার স্পর্ধা দেখায়, তবে ক্ষমতায় এলে কী বিভীষিকা তৈরি করতো আপনারা খালি একবার ভেবে দেখবেন তাই এদেরকে শুধু হারানো নয় শূন্য করতে হবে।”
অভিষেক মনে করিয়ে দেন, রাজ্যে যে ‘পথশ্রী’ প্রকল্পের কাজ হচ্ছে তাতে মোদী সরকার এক পয়সাও দেয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সেই রাস্তা বানাচ্ছে। বীরভূমের ১০-১১ লক্ষ মহিলা যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন, তার কৃতিত্বও রাজ্য সরকারের।
এদিন সভা শেষে অভিষেক কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তৃণমূল জিতলে মানুষ দু’মুঠো ভাত পাবে, আর বিজেপি থাকলে হবে শুধু ধর্মের বিভাজন। তাই বীরভূমের মাটি থেকে পদ্মফুল উপড়ে ফেলে জোড়াফুল ফোটানোর লড়াই শুরু হোক আজ থেকেই।”
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং আধার বা এসআইআর (SIR) ইস্যুতেও সুর চড়ান ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। অমর্ত্য সেন, অভিনেতা দেব এবং ক্রিকেটার মহম্মদ শামির মতো ব্যক্তিত্বদের নোটিশ পাঠানো নিয়ে তিনি কেন্দ্রের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “অমর্ত্য সেনের মতো নোবেলজয়ীকেও এরা রেয়াত করছে না। আসলে এরা বাঙালিদের ‘আনম্যাপ’ করতে চায়। আগামী নির্বাচনে এই বাংলা বিরোধীদেরই আনম্যাপ করে দিতে হবে।”
বাংলার বকেয়া টাকা আটকে রাখা নিয়ে তিনি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “বুকের পাটা থাকলে সংবাদমাধ্যমের সামনে তথ্যের নিরিখে তর্কে আসুক বিজেপি নেতারা। ১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে রাখা হয়েছে, যা পেলে রাজ্যের প্রতিটি বুথে আড়াই কোটি টাকার বাড়তি কাজ হতো।”
পাশাপাশি স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও আর্থিক তছরুপের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “যাঁরা একসময় সিপিএমের হার্মাদ ছিলেন, তাঁরাই এখন জামা পাল্টে বিজেপি হয়েছেন।”
এদিন সভাস্থলে সাধারণ মানুষের ভিড় ও উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। অভিষেকের বার্তা, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে প্রতিটি বুথে লিড বাড়াতে হবে এবং বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে ‘ভোকাট্টা’ করতে হবে।