কীভাবে প্রচলন হল ক্ষেত্র দেবীর ব্রত? নেপথ্যে কোন কাহিনি?

অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবারে ধান চাষের মাঠে এই ক্ষেত্র পুজোর রীতি প্রচলিত। কিভাবে এই ব্রত প্রচলিত হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে এক অজানা প্রচলিত কাহিনী। ‌

December 11, 2023 | 3 min read

Authored By:

Drishti Bhongi Drishti Bhongi

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি: ছেলে মেয়ে দুজনেই এই ব্রত পালন করতে পারেন। বিবিধ রকম ফলমূল, চিঁড়ে, মুড়কি, নাড়ু দিয়ে ক্ষেত্র দেবীর নৈবেদ্য সাজানো হয়। এই পুজো পালন করা হয় অগাধ ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হওয়ার জন্য। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবারে ধান চাষের মাঠে এই ক্ষেত্র পুজোর রীতি প্রচলিত। কিভাবে এই ব্রত প্রচলিত হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে এক অজানা প্রচলিত কাহিনী। ‌

এক দেশে এক গরিব ব্রাহ্মণ স্ত্রী পুত্র নিয়ে বাস করতেন। হঠাৎ ব্রাহ্মণের মৃত্যু হওয়ায় তার স্ত্রী ও পুত্র অসহায় হয়ে পড়ে। ভিক্ষা করে কষ্টেশিষ্টে তাদের দিন কাটতে কাটত। কিন্তু রোজ তাদের কে ভিক্ষা দেবে!… সেজন্য বামুনি তার পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি গেল। বামুনির বাপের বাড়িতে থাকত ভাই আর ভাইয়ের বউ। সেখানে গিয়ে বামুনি অনেক পরিশ্রম করে, তবে মা ছেলে একটু খেতে পায়। মামা তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই, বদলে ছেলেটাকে দিয়ে তারা সব কাজ করিয়ে নেয়। বাড়িতে কাজের লোক ছাড়িয়ে দিয়ে ,গরু চড়াবার রাখালকে ছাড়িয়ে দিয়ে ছেলেকে দিয়ে তার মামী সব কাজ করিয়ে নেয়। ছেলের কষ্ট বামুনি সহ্য করতে পারে না। বেলা গড়াতেই বামুনি তার জন্য ঘটি করে জল বাতাসা, মুড়ি মুড়কি যখন যা পায় তাই নিয়ে মাঠে দৌড়ে যায়। সে হাত মুখ ধুয়ে প্রথমে সেই খাবার ‘ক্ষেত্র দেবী’কে উৎসর্গ করে তারপর নিজে খায়। এই ভাবে আধপেটা খেয়ে কোনওরকমে মা ছেলের দিন কাটত।

দুপুরে একদিন ছেলের কপালে পাতে জোটে মামাদের পাতের কুড়ানো ভাত। সেই ভাত আবার শুকিয়ে চাল হয়ে গেছে। তা দেখে বামুনি তাড়াতাড়ি ঘরে যে দুধে জাল দেওয়া ছিল, তার সর তুলে তাকে খেতে দেয়। মামী তা দেখতে পেয়ে তার মাকে খুব কড়া কড়া কথা শোনায়। তারপর মামী বামুনি ও ছেলের নামে মামাকে নানা কথা বলে মামার কান ভারী করে দেয়। সেইসব কথা শুনে মামা খুব রেগে যায়,পরের দিন তার বোন ও বোনপোকে বলে তাদের আর সেখানে থাকা খাওয়া হবে না। সেই দিন ছিল অগ্রহায়ণ মাসের বৃহস্পতিবার। সারাদিন অভুক্ত থেকে বামুনি ও তার ছেলে ক্ষেতের ধারে গাছতলায় বসে কাঁদতে থাকে।

ক্ষেত্রদেবী এই দেখে ওদের কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না এবং বুড়ির বেশে দেখা দিয়ে ছেলেটাকে কতগুলি ধান দিলেন। ধানের অর্ধেক বিক্রি করে ছেলেটাকে মুড়ি, মুড়কি কিনে খাবার জন্য বললেন আর বললেন ঐ দূরে মাঠের পাশে যে কুঁড়ে ঘর আছে সেখানে সেই রাতে মা ছেলে শুয়ে সকালে উঠে ওই মাঠের চারদিকে ধানগুলো যেন ছড়িয়ে দেয়। তাহলে আর তাদের অভাব থাকবে না। তারপর বুড়ির বেশে ক্ষেত্রদেবী চলে গেলেন।

ছেলেটি সেই বুড়ির কথামতো তাই করল। খাবার কিনে প্রথমে ক্ষেত্রদেবীকে উৎসর্গ করে তারপর তারা খেল। তার পরের দিন সকালে স্নান করে মাঠের চারপাশে বাকি ধান ছড়িয়ে দিল। একদিন পর সকালে তারা দেখল ধান গাছে চারদিক ভরে আছে আর সেই ধান গাছে সোনার ধান ফলে আছে। সেই কথা জমিদারের কানে পৌঁছালে জমিদার লোকজনকে সঙ্গে করে দেখতে এল এবং মা ছেলের দুঃখের কথা শুনল। এর পর জমিদার তার মেয়ের সাথে ছেলেটির বিয়ের প্রস্তাব দিল। খুব ঘটা করে জমিদারের মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল। এরপর সোনার ধান বিক্রি করে তাদের অবস্থা জমিদারের সমান হয়ে গেল।

অন্য দিকে তার মামার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ গেল। বামুনি ও তার ছেলে মামার বাড়ি ছেড়ে যাবার পর মামার বাড়িতে গরু বাছুর সব মারা যায়। তার মামা, মামী লোকের বাড়ি কাজ করতে শুরু করে । একদিন মামা মামী ছেলেটির বাড়ি দিনমজুরের কাজে আসে। সে সেটা দেখতে পেলে মামা মামীকে ঘরে এনে তাদের খুব যত্ন করে। মামি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্না কাটি করায় সে বলে, “এই সব আমার ক্ষেত্র দেবীর ভাগ্যে পাওয়া।” তার কাছে খুব আদর যত্ন পেয়ে মামা মামী আর যাবার নাম করে না। কিছু দিন পর ছেলেটি মামা মামীকে ক্ষেত্র ব্রত পালন করতে বলে। সে ব্রতর নিয়ম শিখিয়ে দিয়ে সঙ্গে কিছু টাকা দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

ক্ষেত্র ব্রত পালন করার পর থেকে মামা মামী তাদের গোলাভরা ধান, গরু, বাছুর থেকে শুরু করে হারানো সব সম্পদ ফিরে পায়। এরপর থেকে সবাই নিয়ম মেনে এই ক্ষেত্র ব্রত পালন করতে থাকে। এভাবে ক্ষেত্র ব্রত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্র:

১) মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ শ্রীকালীকিশোর বিদ্যাবিনোদ সংকলিত ও শ্রীসুরেশ চৌধুরী কর্তৃক সংশোধিত প্রকাশকঃ অক্ষয় লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫

২) মেয়েদের ব্রতকথা: লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৭-২০

৩) মেয়েদের ব্রতকথা: লেখক: গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৪৪-১৪৬

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

ভিডিও

আরও পড়ুন

Decorative Ring
Maa Ashchen