‘পালটানো দরকার’ বনাম ‘মেয়ের কাছেই থাকবে বাংলা’: মোদী-অভিষেক দ্বৈরথে এগিয়ে কে?

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৭:১৩: বঙ্গে নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। সেই সঙ্গে চড়তে শুরু করেছে রাজনৈতিক পারদ। একদিকে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। দুই শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের বাদানুবাদে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। আজ রবিবার, সিঙ্গুরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণের জবাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নদীয়ার চাপড়ায় রোড শো-এর পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে।স্লোগান থেকে উন্নয়ন, সংস্কৃতি থেকে দুর্নীতি- সব বিষয়েই মোদীকে ইঞ্চি ইঞ্চিতে বুঝিয়েদিয়েছেন তৃণমূল সেনাপতি।
‘মহাজঙ্গলরাজ’ বনাম ‘দিল্লির জল্লাদ’
সিঙ্গুরের সভা থেকে সুর চড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্লোগান দিয়েছেন, “পালটানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।” রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘মহাজঙ্গলরাজ’-এর সঙ্গে তুলনা করে দাবি করেন, বিহারের মতো বাংলা থেকেও এই সরকারকে বিদায় করতে মানুষ প্রস্তুত। মোদীর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার সাধারণ মানুষের শত্রুতা করছে এবং তোষণের রাজনীতি চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, নদীয়ার মাটি থেকে পাল্টা হুঙ্কার ছেড়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির ‘পালটানো দরকার’ স্লোগানের উত্তরে তিনি বলেন, “মোদী বাবু আগে নিজের দিল্লি সামলান। বাংলার মেয়েই বাংলা সামলাবে।” অভিষেক বিজেপি নেতাদের ‘দিল্লির জল্লাদ’ এবং ‘বহিরাগত’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর কথায়, “”আপনি বলেছেন পাল্টানো দরকার। আমি আপনার সাথে একমত- পাল্টানো দরকার। পরিবর্তন দরকার। তবে পরিবর্তন হবে আপনাদের! যারা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে সভা শুরু করত, তারা এখন ‘জয় মা কালী’ আর ‘জয় মা দুর্গা’ বলে সভা শুরু করছে। পাল্টাচ্ছেন আপনারা, পাল্টেছেন আপনারা। কিন্তু তৃণমূল বা বাংলার মানুষকে পাল্টানো যাবে না।”
উন্নয়ন ও প্রকল্পের তরজা
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে অভিযোগ করেন, তৃণমূল সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি বাংলায় বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। আয়ুষ্মান ভারত থেকে শুরু করে মৎস্যজীবীদের জন্য ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, সব কিছুতেই রাজ্য সরকার ‘ব্রেক’ কষে দিয়েছে বলে দাবি মোদীর। তিনি ত্রিপুরায় বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের জলের সংযোগের সাফল্যের উদাহরণ টেনে বাংলার দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। মোদী বলেন, “এখানে মাফিয়াদের ছাড়া বিনিয়োগ আসবে না, বিজেপি সিন্ডিকেট ট্যাক্স বন্ধ করবে।”
এর কড়া জবাব দিয়েছেন অভিষেক। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “আসুন পরিসংখ্যান আর তথ্যের নিরিখে লড়াই হোক। একদিকে মমতার রিপোর্ট কার্ড, অন্যদিকে মোদীর।” অভিষেকের দাবি, আয়ুষ্মান ভারতের চেয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প অনেক বেশি কার্যকরী, যেখানে সাইকেল-টিভি থাকলেও সুবিধা পাওয়া যায়। ১০০ দিনের কাজের টাকা এবং আবাস যোজনার টাকা কেন্দ্র আটকে রাখলেও রাজ্য সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে তা মিটিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, “”আপনারা মাথায় রাখবেন, যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আছে, আপনাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কেউ বন্ধ করতে পারবে না। আর এদেরকে খাঁচায় বন্দি করতে হবে। চলবে না অন্যায়, টিকবে না ফন্দি- জনগণের আদালতে মোদীবাবু হবেন বন্দি।” তাঁর অভিযোগ, “বিজেপি জিততে পারেনি বলে বাংলার মানুষকে ভাতে মারতে চাইছে।”
বাঙালি আবেগ ও সংস্কৃতি
সাংস্কৃতিক মেরুকরণেও দুই নেতার বক্তব্য ছিল বিপরীতমুখী। প্রধানমন্ত্রী মোদী ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে বাঙালি আবেগকে ছুঁতে চেয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, বিজেপি সরকারই নেতাজির নামে দ্বীপের নামকরণ করেছে এবং দুর্গাপুজোকে ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাইয়ে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে।
পাল্টা হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বিজেপি বাংলার মণীষীদের অপমান করছে। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা, অমর্ত্য সেনকে নোটিশ পাঠানো এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে বিজেপি নেতাদের অজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। অভিষেকের প্রশ্ন, “যারা মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারা আবার হিন্দু ধর্মের ধারক-বাহক হয় কী করে?” তিনি আরও বলেন, বিজেপি এনআরসি ও সিএএ-র জুজু দেখিয়ে বাঙালিদের বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দিচ্ছে।
সন্দেশখালির ঘটনা এবং শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিকে হাতিয়ার করে মোদী যেমন তৃণমূলকে কোণঠাসা করতে চেয়েছেন, তেমনই অভিষেক মূল্যবৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। মোদীর এজেন্সিতে দিয়ে ভয় দেখানোর পালটা অভিষেকের অঙ্গীকার “মেরুদণ্ড বিক্রি করব না, দিল্লির কাছে মাথা নত করব না।”
বাংলার মাটিতে এখন স্লোগানের লড়াই! একদিকে দিল্লির হুঙ্কার, অন্যদিকে বাংলার অধিকার। মোদীর “পালটানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার” বনাম অভিষেকের “মেয়ের কাছেই থাকবে বাংলা, পারলে এবার মোদীবাবুর দিল্লি সামলা।”। দিল্লি থেকে ভেসে আসছে পরিবর্তনের ডাক, আর বাংলার মাটি থেকে পাল্টা গর্জন শোনা যাচ্ছে প্রতিরোধের। কেন্দ্রীয় এজেন্সি থেকে শুরু করে এসআইআর নোটিস, চারদিকে যখন হামলার বাতাবরণ, তখন মানুষের রায় কিন্তু মমতার পাশেই। তাই লড়াই যাই হোক, শেষ হাসি হাসবে বাংলার সংস্কৃতি আর উন্নয়নই, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।