“বিজেপির খেলা শেষ” লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে সুপ্রিম নির্দেশ হাতিয়ার করে হুঙ্কার অভিষেকের

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৫:০০: ছাব্বিশের নির্বাচনকে সামনে রেখে বারাসাতের রণ সংকল্প সভা থেকে সুর চড়ালেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি এবং বাংলার সংস্কৃতি, একাধিক ইস্যুতে বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। তাঁর সাফ বার্তা, “এই নির্বাচন বিজেপিকে শাস্তি দেওয়ার, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নির্বাচন।”
এদিন সভার শুরুতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (Logical Discrepancy)-র নাম করে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছিল নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি। বিশেষ করে গরিব ও বয়স্ক মানুষদের নিশানা করা হচ্ছিল বলে তাঁর দাবি। অভিষেক বলেন, “আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে তা টাঙাতে হবে। শুধু তাই নয়, শুনানির সময় বিএলএ-২ (BLA-2) প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন এবং যাঁদের ডাকা হচ্ছে তাঁদের রসিদ দিতে হবে।” এই রায়কে তিনি ‘মা-মাটি-মানুষের জয়’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “যারা বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট তাদের দু-গালে কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট তৃণমূলের দাবিকে মান্যতা দিয়ে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি লিস্ট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতিদের উপস্থিতিতে রসিদ দিতে হবে। বিজেপির খেলা শেষ।”
তিনি আরও যোগ করেন, যারা বাংলার মানুষের ভাতে মারতে চেয়েছিল এবং ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের গালে কষিয়ে চড় মেরেছে। তাঁর হুঙ্কার, “আজ কোর্টে হারিয়েছি, এপ্রিলে ভোটে হারাবো।”
বিজেপি নেতাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে জ্ঞানের অভাবকে তীব্র কটাক্ষ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলছেন, যেন ছোটবেলায় একসঙ্গে ক্যারাম খেলতেন!অমিত শাহ কবিগুরুর জন্মস্থান জানেন না, তাঁকে ‘রবীন্দ্রনাথ স্যান্যায়’ বলছেন।” বিজেপি নেতাদের স্বামী বিবেকানন্দ বা বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি ভাষায় কথা বলতেন তা কি ওরা জানে?”
বিজেপি নেতাদের ‘বহিরাগত’ ও ‘বাংলা-বিরোধী’ তকমা দিয়ে এদিন চড়া সুরে আক্রমণ করেন অভিষেক। বাংলার সংস্কৃতি ও মনীষীদের নিয়ে বিজেপি নেতাদের অজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্রকে বলছেন ‘বঙ্কিমদা’, যেন ছোটবেলায় একসঙ্গে ক্যারাম খেলতেন! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথের নাম ভুল পড়ছেন, জেপি নাড্ডা রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান জানেন না। সুকান্ত মজুমদার স্বামী বিবেকানন্দকে ‘অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট’ বলছেন।” তাঁর হুঙ্কার, যারা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙে এবং মা দুর্গার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাদের ব্যালটেই জবাব দেবে বাংলা। উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি বিধানসভা আসনেই তৃণমূলের জয়ের ব্যাপারে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, “যে ধর্ম বিভাজন শেখায় না, সেখানে একজন চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে মারা হয় কোন হিন্দু ধর্মে? আমরা স্বামীজির হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করি, যোগী আদিত্যনাথের হিন্দু ধর্মে নয়।”
তিনি আরও বলেন, “বিজেপি নেতারা বলছেন মুসলমানের থেকে বিরিয়ানি কিনবেন না। আমার প্রশ্ন, যারা এই কথা বলছেন, তারা কি জামা পরার আগে বা অ্যাম্বুলেন্স চালকের ধর্ম জিজ্ঞেস করেন? এই মাটি সম্প্রীতির মাটি।”
১০০ দিনের কাজ এবং আবাস যোজনার টাকা আটকে রাখা নিয়ে কেন্দ্রকে আক্রমণ করে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে একটি বিশেষ পরামর্শ দেন। অভিষেক বলেন, “বিজেপি টাকা দিয়ে ভোট কিনতে এলে টাকা নেবেন, কিন্তু ভোট দেবেন জোড়া ফুলেই।” তাঁর মতে, এই নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য নয়, বরং যারা বাংলার মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা নিয়েও সরব হন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যে অত্যাচার হলেও বাংলার মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে ভোটের আগে বিজেপির টাকা ছড়ানো প্রসঙ্গে ভোটারদের উদ্দেশে কৌশলী বার্তা দেন অভিষেক। তিনি বলেন, “বিজেপি টাকা দিলে নিয়ে নেবেন। ওটা আপনার টাকা, বাংলার টাকা। কিন্তু ভোটটা জোড়াফুলেই দেবেন। এমনভাবে ভোট দেবেন যাতে পদ্মফুলের নেতারা চোখে সরষে ফুল দেখে।”
দেশের স্বাধীনতার সময় বিজেপির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং নেতাজির বংশধরকে নোটিশ পাঠানোর নিন্দা জানিয়ে অভিষেক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, “তৃণমূল ২৫০-র বেশি আসনে জিতবে এবং বিজেপিকে ৫০-এর নিচে নামিয়ে আনব।”