SIR-এ আধার ও অ্যাডমিট কার্ড গ্রাহ্য হবে, সুপ্রিম রায়ে ‘স্বচ্ছতা’র জয় দেখছে তৃণমূল

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৯:০৪: আধার ও অ্যাডমিট কার্ড এবং SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়কে বড় জয় হিসেবে দেখছে তৃণমূল। সোমবার তৃণমূল ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের তিন মন্ত্রী পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmik), চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya) ও ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) এই রায়কে সাধারণ মানুষের অধিকারের জয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের সার্থকতা বলে অভিহিত করেন।
এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে পার্থ ভৌমিক স্পষ্ট জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এখন থেকে অ্যাডমিট কার্ড এবং আধার কার্ড; উভয়কেই মান্যতা দিতে হবে। তিনি বলেন, “যেসব ক্ষেত্রে আধার বা অ্যাডমিট কার্ড গ্রাহ্য করা হবে না, সেই তালিকা নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে জমা দিতে হবে। এতদিন হিয়ারিং-এ গিয়ে মানুষ কোনো প্রাপ্তিস্বীকার পত্র বা ‘রিসিভ’ পাচ্ছিলেন না, যা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। আজ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, রিসিভ দিতেই হবে। প্রয়োজনে হিয়ারিং প্রক্রিয়া আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।” আদালতের এই রায়কে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এই রায়কে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল কমিশনের কাছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা চেয়েছিল, যা তখন দেওয়া হয়নি। আজ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, পঞ্চায়েত ও ওয়ার্ড অফিসের সামনে সেই তালিকা টাঙিয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষ জানতে পারেন কেন তাদের নাম বাদ যাচ্ছে।” তিনি আরও জানান, শুনানির কেন্দ্রগুলির বিকেন্দ্রীকরণ এবং সেখানে বিএলএ-২ (BLA-2) প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দিয়ে আদালত ‘প্রিন্সিপালস অফ ন্যাচারাল জাস্টিস’ বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে।
এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে তীব্র রাজনৈতিক ভাষায় বিজেপিকে আক্রমণ করেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। বারাসতের সভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তার রেশ টেনে তিনি বলেন, “দিল্লি এতদিন আমাদের কথায় কর্ণপাত করেনি, কিন্তু আজ সুপ্রিম কোর্ট আমাদের প্রতিটি দাবি মেনে নিয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, এসআইআর (SIR)-এর নামে বড় অংশের বাঙালির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে চক্রান্ত বিজেপি করছিল, এই রায়ের ফলে তা ভেস্তে গেল।
বিজেপিকে কটাক্ষ করে ব্রাত্য বসু চার্চিল ও স্ট্যালিনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “বিজেপি চেয়েছিল ১২ কোটি বাঙালিকে ‘মুণ্ডহীন মুরগি’র দশায় ফেলতে। কিন্তু আমরা আদার ব্যাপারী হতে পারি, আদানির ব্যাপারী নই। জাহাজের খবর আমরাও রাখি।” তিনি এই লড়াইকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং ‘বঙ্গজাতির অস্তিত্বের লড়াই’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর কথায়, সিএএ-র জুজু দেখিয়ে মানুষকে ‘বেনাগরিক’ করার যে চেষ্টা চলছিল, আদালতের রায়ে মানুষ তার মোক্ষম জবাব পেল।
সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূল নেতৃত্ব প্রশ্ন তোলেন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। তৃণমূলের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ‘ফর্ম সেভেন’ সর্বোচ্চ ১০ জন প্রতিনিধি মিলে জমা দিতে পারেন। কিন্তু সম্প্রতি গাড়িতে করে হাজার হাজার ‘বাল্ক’ ফর্ম ধরা পড়ার পরেই সেই নিয়মে শিথিলতা আনা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, “গাড়িতে বাল্ক ফর্ম ধরা পড়ল বলেই কি রাতারাতি নিয়ম বদলে নোটিফিকেশন জারি হলো? এটা কি পক্ষপাতিত্ব নয়?” দলীয় নেতৃত্বের সাফ কথা, আদালতের পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করেছে যে মনোনীত আধিকারিকদের চেয়ে জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব এবং মানুষের অধিকার অনেক বেশি।
বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয় যে তৃণমূল বিভিন্ন মামলায় আদালতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়ছে। এই দাবি নস্যাৎ করে তৃণমূল নেতৃত্ব বলেন, “সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত আদালত আমাদের বারবার স্বস্তি দিয়েছে। আমরা আইন মেনেই লড়াই করি।” তবে এরাজ্যের বিচারব্যবস্থার একাংশের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, “২০২৪ সালে একজন বিচারক পদত্যাগ করে বিজেপির টিকিটে লড়লেন। এর থেকেই বোঝা যায় কেন কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কাজ করে। তবে সর্বোচ্চ আদালত বরাবরই আমাদের রক্ষাকবচ দিয়েছে।”
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে (লালবাগ, আসানসোল, কালনা) ফর্ম জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা নিয়ে তৃণমূলের ব্যাখ্যা-এটি কোনো দলীয় সংঘর্ষ নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। নেতৃত্বের দাবি, “বিজেপি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে মানুষকে ‘বেনাগরিক’ করতে চাইছে। এসআইআর-এর সাথে সিএএ (CAA)-কে জুড়ে দিয়ে যে ঘৃণ্য রাজনীতি শুরু হয়েছে, এটি তার বিরুদ্ধে গোটা বঙ্গজাতির লড়াই। মানুষ আজ তৃণমূলের পতাকার তলায় এসে সুরক্ষা চাইছে।”
বিজেপি প্রতিনিধি দলের সময়সীমা বাড়ানোর দাবিকেও কটাক্ষ করেছে শাসকদল। তাদের মতে, সুপ্রিম কোর্ট যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে তা-ই চূড়ান্ত। তৃণমূলের তোপ, “বিজেপি আসলে মানুষের অগোচরে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছিল। গাড়ি ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন তারা সময় চাইছে। কিশোর কুমারের মৃত্যুর পর যেমন ডুপ্লিকেট ক্যাসেট বেরিয়েছিল, বিজেপিও তেমন ডুপ্লিকেট কায়দায় মানুষকে ভোটার লিস্ট থেকে ছেঁটে ফেলার ‘বাল্ক’ পলিটিক্স করছে।”
বাংলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে জানে এবং এই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে তৃণমূল শেষ পর্যন্ত মানুষের পাশে থাকবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, নির্বাচন কমিশন এতদিন যে অস্বচ্ছতা বজায় রেখেছিল, সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ে তা দূর হলো এবং বাংলার মানুষের হকের লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করল।