‘দিল্লি কি এখন ধর্ষণের রাজধানী?’ নাবালিকা নিগ্রহের ঘটনায় কেন্দ্রকে তীব্র ভর্ৎসনা তৃণমূলের

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৬:৩০: দিল্লিতে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে অপহরণ ও পাশবিক ধর্ষণের ঘটনায় গর্জে উঠল তৃণমূল কংগ্রেস। শুক্রবার, ২৩শে জানুয়ারি তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ ভৌমিক এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দিল্লির আইনশৃঙ্খলা ও নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সরাসরি প্রশ্ন করেন, “দিল্লি কি এখন রাষ্ট্রের রাজধানী নাকি অত্যাচার ও ধর্ষণের রাজধানী?”
সরস্বতী পুজোর আবহে এমন জঘন্য ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন চন্দ্রিমা। তিনি বলেন, “এত অন্ধকারে আচ্ছন্ন বসন্ত পঞ্চমী, এটা কি কেউ কোনওদিন ভেবেছিল?” ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের রাজধানীতে পেটের দায়ে ট্রাফিক সিগন্যালে গোলাপ ফুল বিক্রি করত ১১ বছরের একটি শিশু। সেখান থেকেই তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। নির্ভয়া কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমরা সেই নির্ভয়া থেকে দেখে আসছি সেখানকার কী অবস্থা। দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, সেখানে বিজেপি ক্ষমতায়। তাহলে এমন ঘটনা ঘটে কী করে?”
এই ঘটনায় জাতীয় মহিলা কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চন্দ্রিমা। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলায় ছোটখাটো ঘটনা ঘটলেই জাতীয় স্তরের প্রতিনিধিরা ছুটে আসেন, কিন্তু দিল্লির এই ঘটনায় তাদের দেখা মিলছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মেয়েটি কি বিচার পাওয়ার কোনও যোগ্যতা রাখে না?”
এদিন এনসিআরবি (NCRB)-র রিপোর্ট তুলে ধরে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির সঙ্গে কলকাতার অপরাধ চিত্রের তুলনা করেন চন্দ্রিমা। তিনি বলেন, “বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা বাংলায় এসে পরিবর্তনের কথা বলেন। আসলে পরিবর্তন আপনাদের মানসিকতার দরকার।” পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, কলকাতায় অপরাধের হার সবচেয়ে কম এবং এটিই দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহর। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশে ১৫,৭৪৩ টি এবং মহারাষ্ট্রে ৪৫,৩৩১ টি মহিলাদের ওপর অত্যাচারের মামলা রুজু হয়েছে।
কেন্দ্রের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ স্লোগানকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। মোদী সরকারের জমানায় নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে চন্দ্রিমা জানান, ২০১৩ সালে যেখানে সারা দেশে এই ধরণের অপরাধের সংখ্যা ছিল ৩.০৯ লক্ষ, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৫ লক্ষে। রাজধানীর বুকে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছে তৃণমূল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তৃণমূলের এক্স হ্যান্ডেলে এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, “দিল্লিতে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে অপহরণ ও পাশবিক ধর্ষণের ঘটনা নারী সুরক্ষা এবং সুশাসন নিয়ে বিজেপির দাবিগুলোকে আবারও অন্তঃসারশূন্য বলে প্রমাণ করেছে। এটি কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার এবং ব্যর্থতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বাংলাকে সুশাসন নিয়ে জ্ঞান দিতে পারেন, তবে তাদের নিজেদের প্রশাসনের অধীনে শিশুদের নিরাপত্তার অভাব নিয়েও জবাব দিতে হবে। বিচার কখনো বেছে বেছে হতে পারে না; আর এই ধরনের বর্বরতার মুখে নীরব থাকা আসলে তাদের চরম ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।”
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যে নারীদের ওপর নির্যাতন চললেও গেরুয়া শিবির নীরব, অথচ বাংলায় রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে তারা তৎপর। এদিন মধ্যপ্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপিকে সরাসরি নিশানা করেন পার্থ ভৌমিক। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থা অপরাধমূলক উদাসীনতার সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৪ সালে সেখানে ৭,২০০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। অথচ সেখানে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ২২ শতাংশ।” দিল্লির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “দিল্লিতে পুলিশ, পুরনিগম ও কেন্দ্রীয় সরকার- সবই বিজেপির হাতে। এটি একটি ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার। অথচ রাজধানী আজ ভারতের ‘রেপ ক্যাপিটাল’। সম্প্রতি এক ১১ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণের ঘটনা নির্ভয়ার স্মৃতি উস্কে দিয়েছে। যারা দিল্লির নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের বাংলায় এসে পরিবর্তনের কথা বলার নৈতিক অধিকার নেই।”
অন্যদিকে, ওড়িশার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সরব হন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ওড়িশায় ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অথচ বিজেপির তরফে কোনও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিম যায়নি, কোনও প্রাইম টাইম বিতর্কও হয়নি। বিজেপি শাসিত রাজ্য হলে তারা নীরব থাকে, আর বাংলায় কিছু হলেই রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ক্যামেরা নিয়ে ছুটে আসে।”
বিজেপির বিরুদ্ধে ‘সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস’ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তোলেন চন্দ্রিমা। তিনি বলেন, “বিজেপি ঠিক করে দিতে চায় আপনি কী খাবেন, কী পরবেন। তারা বাংলায় ক্ষমতা দখল করলে মানুষের মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া বন্ধ করে দেবে। তারা মানুষকে মধ্যযুগীয় সভ্যতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। মাছ বা গোমাংস রপ্তানির টাকা নিতে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু খাওয়ার বেলায় নিষেধাজ্ঞা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই একমাত্র এই প্রক্রিয়া রুখতে পারেন।”
ব্রীজভূষণ শরণ সিং এবং উন্নাও ধর্ষণ কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে পার্থ ভৌমিকের সংযোজন, “বিজেপি সাংসদ ব্রীজভূষণের বিরুদ্ধে দেশের চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগীররা অভিযোগ আনলেও তাঁকে আড়াল করা হয়েছে। উন্নাওতে ধর্ষকদের মালা দিয়ে বরণ করা হয়েছে। বিজেপি কি চায় বাংলার অবস্থাও দিল্লির মতো হোক? বাংলার মানুষ এই অপমান এবং দ্বিচারিতা মেনে নেবে না।”
তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, বিজেপি নেতাদের উচিত আগে নিজেদের শাসিত রাজ্যগুলির দিকে নজর দেওয়া এবং সেখানে ‘পরিবর্তন’ আনা। সংবাদমাধ্যম ও জাতীয় মহিলা কমিশনের ভূমিকা নিয়েও এদিন প্রশ্ন তোলেন দুই তৃণমূল নেতা।
বিস্তারিত আসছে….