‘২৬শের ভোটে আগে হিরণ-কাণ্ডে বিপাকে বিজেপি, খড়গপুরে অ্যাডভান্টেজ তৃণমূলের?

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৫:৪৫: ছাবিশের বিধানসভা নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। তার আগেই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রবল বিতর্কের মুখে খড়গপুর সদরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়। বারাণসীতে গিয়ে বিধায়কের দ্বিতীয় বিয়ের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। একদিকে প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক অভিযোগ এবং অন্যদিকে সমাজমাধ্যমে ট্রোলিং- সব মিলিয়ে হিরণের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। আর এই ডামাডোলের মাঝেই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস।
হিরণের দ্বিতীয় বিয়ের ছবি ভাইরাল হতেই মুখ খুলেছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, হিরণের সঙ্গে তাঁর এখনও কোনও আইনি বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। অনিন্দিতার কথায়, রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই হিরণের ‘স্পর্ধা’ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাঁটুর বয়সী মেয়েকে বিয়ে করা নিয়ে সমাজমাধ্যমে যেমন সমালোচনার ঝড় উঠেছে। গোটা ঘটনায় ‘এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে রাজ্য বিজেপির জন্য।
হিরণ-কাণ্ডে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন। শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী বা সুকান্ত মজুমদা- কেউই প্রকাশ্যে এই নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ। দলের অন্দরের খবর, হিরণের সঙ্গে রাজ্য নেতৃত্বের যোগাযোগ এমনিতেই খুব একটা নিবিড় ছিল না। উত্তরবঙ্গের এক বিজেপি বিধায়কের মতে, হিরণ দলের সাথে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে কাটছিল, তা জানার সুযোগও ছিল না। তবে নির্বাচনের আগে এ ধরনের বিতর্ক দলের জন্য একেবারেই ইতিবাচক কোনো বার্তা নয়। খড়গপুর সদরের স্থানীয় বিজেপি নেতারাও হিরণ প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলায় স্পষ্ট, দল এই বিতর্কের দায় নিতে নারাজ। অতীতে দিলীপ ঘোষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চর্চা হলেও তিনি দলের সমর্থন পেয়েছিলেন, কিন্তু হিরণ কার্যত কোণঠাসা।
হিরণ যখন বিতর্কে বিদ্ধ, তখন রাজনৈতিক মহলে ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। মেদিনীপুরের একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা দিলীপবাবু গত লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর থেকে পরাজিত হওয়ার পর কিছুটা অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি ‘শাহী’ সফরের পর ফের চনমনে তিনি। এক সংবাদমাধ্যমে তিনি ২০২৬-এর নির্বাচনে খড়গপুর সদর থেকে লড়ার ইচ্ছাপ্রকাশও করেছেন। হিরণের সঙ্গে দিলীপের দীর্ঘদিনের দূরত্বের কথা কারও অজানা নয়। স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের একাংশও চাইছেন, হিরণকে সরিয়ে দিলীপ ঘোষকেই ফের প্রার্থী করা হোক। যা নিয়ে খড়গপুরে চওড়া হচ্ছে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব।
অন্যদিকে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকারকে মাত্র সাড়ে তিন হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন হিরণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাব্বিশের নির্বাচনের প্রাক্কালে হিরণের এই ভাবমূর্তি সংকট তৃণমূলের জন্য বড় ‘অ্যাডভান্টেজ’। বিধায়কের ব্যক্তিগত কেচ্ছাকে হাতিয়ার করে খড়গপুর সদরে হারানো জমি ফিরে পেতে মরিয়া শাসকদল। ২০১৯ সালের উপ-নির্বাচনে জয়ের পুনরাবৃত্তি করতে তৃণমূল ইতিমধ্যেই নতুন স্ট্রাটেজি সাজাচ্ছে। দলীয় সূত্রে খবর, ব্লক সভাপতিদের পাশাপাশি কোর কমিটির মাধ্যমে সরাসরি নিচুতলার সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল শুরু করেছে ঘাসফুল শিবির।
সব মিলিয়ে, হিরণের দ্বিতীয় বিয়ে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, খড়গপুর সদরের রাজনৈতিক সমীকরণেও বড়সড় ওলটপালট ঘটাতে চলেছে। এখন দেখার, বিজেপি ২০২৬-এ হিরণের ওপরই আস্থা রাখে, নাকি দিলীপ ঘোষের হাতেই ব্যাটন তুলে দেয়। তবে আপাতত এই পুরো ঘটনায় ব্যাকফুটে গেরুয়া শিবির। আর জয়ের স্বপ্ন বুনছে তৃণমূল।