জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন-অনুষ্ঠানে সংবিধান, গণতন্ত্রকে বাঁচানোর আর্জি মমতার
নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৮:০০: আজ, শনিবার জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাই কোর্টের সার্কিট বেঞ্চের (Jalpaiguri Circuit Bench) স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন হল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়াল এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ উপস্থিত ছিলেন বর্তমান এবং প্রাক্তন একাধিক বিচারপতি৷ সেখানেই সংবিধানকে রক্ষা করার আর্জিও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন ভারতের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির সামনেই কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মমতার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করে মানহানি করা হচ্ছে৷ বিচারপতিদের সামনেই সংবিধানকে রক্ষা করার আর্জি জানান মমতা।
জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাই কোর্টের সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মানুষ বিচারব্যবস্থার উপরে ভরসা করেন৷ বিচারব্যবস্থা আমাদের সংবিধানের রক্ষাকর্তা৷ দেশের সব মানুষের পক্ষ থেকে আমার অনুরোধ, আমরা যেন একতার পক্ষে কাজ করি, কথা বলি৷ কোনও ধর্মীয়, জাতপাতের ভিত্তিতে যেন কোনও ভেদাভেদ না থাকে৷’’
এদিন উপস্থিত বিচারপতিদের উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলেন, ‘‘আমাদের প্রধান বিচারপতি সহ সব বিচারপতিকে আমার অনুরোধ, আমাদের সংবিধান, গণতন্ত্র, নিরাপত্তা, ইতিহাসকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচান৷ মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ হোক৷ এখন মানুষকে বদনাম করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে৷ বেশ কিছু এজেন্সি ইচ্ছাকৃতভাবে মানহানি করছে৷ আমি নিজের জন্য বলছি না, গণতন্ত্র, দেশ, বিচারব্যবস্থা, সংবিধান, দেশের মানুষকে বাঁচান, সংবিধানকে বাঁচান৷ আমরা আপনাদের কাস্টডিতে রয়েছি৷ আপনারা সংবিধানের রক্ষাকর্তা৷ বিচারব্যবস্থার উপরে কেউ নেই৷’’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতেই মোদী সরকারের বঞ্চনা নিয়ে সরব হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘৮৮টি ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরিতে বরাদ্দ বন্ধ করেছে কেন্দ্র। ৭টি পকসো কোর্ট, ৪ লেবার কোর্ট, ১৯ হিউম্যান রাইটস কোর্ট হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টকে জমিও দেওয়া হয়েছে। আরও অনেক কাজ হয়েছে। নতুন করে ষষ্ঠ জাজেস কোর্ট তৈরি হয়েছে। সাব ডিভিশ্নাল জাজেস কোর্ট হয়েছে।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে। ঐক্য নিয়ে সকলকে কথা বলতে হবে। এই সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন উত্তরবঙ্গের জন্য অনেক বড় বিষয়। উত্তরবঙ্গবাসীর জন্যে আজ ঐতিহাসিক দিন। একটা মাইলস্টোন। যাঁরা এই ভবন তৈরি করেছেন তাঁদের অভিনন্দন। ৪০.০৮ একর জমির উপর তৈরি করা হয়েছে এই ভবন।”
উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন হল। এবার থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষকে বিচার পাওয়ার জন্য আর বার বার কলকাতায় ছুটতে হবে না। ২০১২ সালে এই সার্কিট বেঞ্চের শিলান্যাস হয়েছিল। শহরের স্টেশন রোডে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় অস্থায়ীভাবে ২০১৯ সালে সার্কিট বেঞ্চের কাজ শুরু হয়। ওই একই বছর পাহাড়পুর এলাকাতেও শুরু হয় স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরির কাজ। ৪০ একর জমির ওপর জলপাইগুড়ি পাহাড়পুর এলাকায় ৩১ডি জাতীয় সড়কের পাশে কলকাতা হাই কোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। মূল ভবনটি পাঁচ তলার, তাতে ১৩টি আদালত কক্ষ তৈরি করা হচ্ছে। ৫ টি ডিভিশন বেঞ্চ এবং ৭ টি সিঙ্গেল বেঞ্চের পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির আদালত সহ মোট ৫টি আদালত তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি আদালত তৈরি কাজ চলছে। স্থায়ী পরিকাঠামোতে বিচারপতিদের জন্য আলাদাভাবে গ্রন্থাগার তৈরি হচ্ছে। আইনজীবিদের জন্য বার লাইব্রেরীও তৈরি হবে।
স্থায়ী পরিকাঠামোতে আইনজীবীদের জন্য তিনটি বসার ঘর তৈরি হচ্ছে। মহিলা আইনজীবীদের জন্যেও আলাদাভাবে তিনটি বসার ঘর থাকছে। আইনি পরিষেবা কেন্দ্রের অফিস, বিভিন্ন মামলার তথ্য সংরক্ষিত রাখতে আধুনিক রেকর্ড রুমের, ডাটা সেন্টার, অ্যাডভোকেট জেনারেল, অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল, সলিসিটার জেনারেলের, অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবীদের অফিস থাকছে। পাহাড়পুর এলাকায় স্থায়ী পরিকাঠামোতে প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিচারপতিরদের জন্য ১০টি বাংলো তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে ইতিমধ্যে তিনটি বাংলো নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সার্কিট বেঞ্চের কর্মীরা রাজবাড়িপাড়ার কম্পোজিট কমপ্লেক্সের সরকারি আবাসনে থাকছেন এখন। কর্মীদের জন্য পাহাড়পুরর স্থায়ী পরিকাঠামোতে ৭টি বহুতলে মোট ৮০টি ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও সার্কিট সার্কিট বেঞ্চের জন্য অডিটরিয়াম, বিচারপতিদের ক্লাব, পুলিশ ব্যারাক তৈরি হচ্ছে। সার্কিট বেঞ্চের জন্য আলাদাভাবে একটি থানাও তৈরি হবে। এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের শাখা, এটিএম এবং পোস্ট অফিসের শাখা তৈরি হবে।