মোদীর গ্যারান্টি নয়, বাংলার ভরসা মমতার ‘কমিটমেন্ট’: তৃণমূল

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ২০:১০: রবিবার সিঙ্গুরে জনসভায় রাজ্যে মমতা সরকারকে টার্গেট করে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এর পরেই তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে পাল্টা তোপ দাগল রাজ্যের শাসকদল। মন্ত্রী শশী পাঁজা এবং রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা পার্থ ভৌমিকের যুগ্ম সাংবাদিক সম্মেলনে উঠে এল সিঙ্গুরের জমি থেকে শুরু করে টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক, রেল প্রকল্প এবং নারী নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। তৃণমূলের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সিঙ্গুরের উন্নয়ন বা কৃষকদের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট দিশা ছিল না। উল্টে জনসভার জন্য কৃষকদের জমি নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছে জোড়াফুল শিবির।
কেন্দ্রের বাংলার প্রতি বঞ্চনা
বাংলার প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনা এবং অপমানের অভিযোগ তুলে এদিন পার্থ ভৌমিক বলেন, “বাংলার উপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা অন্য কোনো রাজ্যে হয়নি। আমি নিশ্চিত যে বাংলা তার পরম্পরা এবং ইতিহাসের গৌরবকে মান্যতা দিয়েই এই অপমান ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। সেই প্রতিবাদ ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, যা আগামী দিনে ভারতবর্ষকে পথ দেখাবে। একটা সময় মহামতি গোখলে বলেছিলেন- ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেনাপতিত্বে গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ‘দলদাসে’ পরিণত করার এই হিটলারি কায়দার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, তা ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর সারা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে দিশা দেখাবে।”
বাংলা ভাষা বিকৃতি প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলা ভাষার গৌরব বৃদ্ধির যে দাবি করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পার্থবাবু। বিজেপি নেতাদের অতীতের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী অনেক কথা বলেছেন। তিনি দাবি করছেন যে তিনি বাংলা ভাষার গৌরব বৃদ্ধি করবেন। আমার জানা নেই বয়সের কারণে ওনার স্মৃতিভ্রম হয়েছে কি না, বা উনি ‘অ্যালঝাইমার’ (Alzheimer’s) রোগে আক্রান্ত কি না। ওনার দলের আইটি সেল প্রবক্তা অমিত মালব্য তো বলেছিলেন- বাংলা ভাষা বলে নাকি কোনো ভাষাই নেই! যিনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলেন, তাঁর মুখে বাংলার ইতিহাস মানায় না। ১৮৭৪ সালে ‘বন্দেমাতরম’ লেখা হয়েছিল, অর্থাৎ ২০২৪ সাল ছিল এর ১৫০তম বর্ষ। অথচ ওনারা ১৫১তম বর্ষে এসে উৎসব পালন করছেন! বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে ওনাদের কোনো ধারণাই নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলেন ‘রবীন্দ্রনাথ সান্যায়’। এদেরই একজন মন্ত্রী বিবেকানন্দকে বলেছিলেন ‘কমিউনিস্ট’। যে রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করেছিলেন, তাঁকে বিজেপির সাংসদ বলেন ‘ইংরেজের দালাল’। এমনকি কলকাতার বুকে বিদ্যাসাগরের মূর্তিও ওনাদের উপস্থিতিতে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। যারা নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনকে হেনস্তা করতে পারে, তারা বাঙালিকে কতটা সম্মান করে তা পরিষ্কার।”
হিন্দু ধর্ম প্রসঙ্গ
ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা পাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতে পুজো নিয়ে বিজেপি নেতাদের অবস্থান ঠিক কী ছিল। অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আজ দাবি করছেন ইউনেস্কোর দুর্গাপূজার স্বীকৃতি নাকি ওনার অবদান! আমি আবার বলছি, ওনার স্মৃতিভ্রম হয়েছে কি না আমার জানা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। দুর্গাপূজার কার্নিভাল বা ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে তিনি যখন এই উৎসবকে বিশ্বজনীন রূপ দিচ্ছিলেন, তখন এই বিজেপির নেতারাই আদালতে মামলা করে তা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। আজ ওনাদের মুখে দুর্গাপূজার কথা শুনলে মানুষ হাসবে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ করছি- বিজেপি শাসিত একটি রাজ্যের নাম বলুন, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী এভাবে হিন্দু ধর্ম পালনের জন্য সরকারিভাবে পাশে এসে দাঁড়ান?
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সিঙ্গুরে শিল্প
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যেরও কড়া সমালোচনা করেন পার্থ ভৌমিক। তিনি মোদীর উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি বাংলায় এসে ‘অনুপ্রবেশকারী’ আর ‘রোহিঙ্গা’র জিগির তুলে বিভেদ সৃষ্টি করছেন। যদি দম থাকে, তবে নির্বাচন কমিশনকে বলুন সেই ৫৪ লক্ষ নামের তালিকা প্রকাশ করতে- কজন রোহিঙ্গা বা অনুপ্রবেশকারী সেখানে আছে।” তাঁর অভিযোগ, “নির্বাচন কমিশনকে আজ হাস্যস্পদ জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। ভোটার লিস্টে জালিয়াতি করে নির্বাচন জেতার চেষ্টা চলছে। সিঙ্গুরে এসে প্রধানমন্ত্রী শিল্প নিয়ে একগুচ্ছ অস্পষ্ট কথা বললেন। তিনি হয়তো জানেন না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ইতিমধ্যেই সেখানে ‘এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ গড়ে তুলছে এবং বিনিয়োগ আসছে। বাম আমলে জমি অধিগ্রহণ ছিল বেআইনি, যা ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টও মেনে নিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই সেই জমি কৃষকদের ফেরত দিয়েছে।”
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও জনসুরক্ষা
বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার ও শিল্পায়নের তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও জনসুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। পার্থবাবু বলেন,”প্রধানমন্ত্রী বলছেন ডবল ইঞ্জিন হলে নাকি শিল্প হবে! ওনারা নোটবন্দি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। অথচ বাংলার আইনশৃঙ্খলা দেখুন- দুর্গাপূজা থেকে গঙ্গাসাগর মেলা, বাংলার মা-বোনেরা রাত জেগে নির্ভয়ে রাস্তায় ঘুরছেন। ওনারা মৎস্যজীবীদের নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই তাঁদের বিমা ও ‘সমুদ্রসাথী’র মতো প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসেছেন।”
সিঙ্গুর ও টাটা প্রসঙ্গ
এদিন রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা পার্থ ভৌমিক বলেন, ‘‘আজ প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুরে অনেক ভাষণ দিলেন, কিন্তু সেখানকার জমি বা উন্নয়ন নিয়ে কোনও দিশা দেখাতে পারলেন না। কারণ বিজেপি শুধু ভাষণ দিতেই আসে, কাজ করতে নয়। কাজ করার মানসিকতা থাকলে কৃষকের জমি নষ্ট করে সভার আয়োজন করত না।’’ তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, নবান্নে সম্প্রতি টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক হয়েছে। টাটা গোষ্ঠী অটোমোবাইল বা আনুষঙ্গিক শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রী ল্যান্ড ব্যাংক থেকে জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। পার্থ ভৌমিকের কথায়, ‘‘প্রধানমন্ত্রী হয়তো শেষ মুহূর্তে এই খবর পেয়েই সিঙ্গুর শিল্প নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করেননি।’’
রেল প্রকল্প ও ‘সেবাশ্রয়’ কটাক্ষ
এদিন প্রধানমন্ত্রীর সভার মাঝেই আচমকা তৃণমূলের ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পের গান বেজে ওঠে। এ নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি পার্থ। তিনি বলেন, ‘‘ওদেরও সেবাশ্রয় ছাড়া গতি নেই। শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্রয়েই সবাইকে আসতে হবে।’’ পাশাপাশি, তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দাবি খণ্ডন করে তৃণমূল জানায়, “২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময় বাজেট বরাদ্দ হয়ে সব চূড়ান্ত হয়েছিল। পরবর্তী সরকারগুলো সেটা নিয়ে এগোয়নি, আর আজ বিজেপি সেটা নিয়ে এমনভাবে বলছে যেন ওনাদের পরিকল্পনা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় বাংলা আজ হেরিটেজ দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে উন্নয়নের শিখরে। তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের কাছে যাচ্ছে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ নিয়ে, আর বিজেপি শুধু ‘জঙ্গলরাজ’-এর মিথ্যা অভিযোগ আর ভাষণের রাজনীতি করছে।”
আয়ুষ্মান ও স্বাস্থ্যসাথী
“সবার আগে কেন্দ্রের সরকার বদলানো দরকার। কেন্দ্রের এই সরকার না বদলালে ভারতবর্ষের কোনও রাজ্য ভালো থাকতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করে নিয়েছেন যে বাংলায় যা উন্নয়ন হয়েছে তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই হয়েছে। যদি আয়ুষ্মান ভারত নিয়ে এতই দরদ থাকে, তবে মোদীজি কি ঘোষণা করবেন যে বাংলার প্রতিটি মানুষকে আয়ুষ্মান কার্ড দেওয়া হবে? উনি তা পারবেন না, কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের সুবিধা সবাই পায়।”
বাংলা ভাষা ও বঞ্চনা
শশী পাঁজা অভিযোগ করেন, বিজেপি বারবার বাংলা ভাষাকে অপমান করেছে। অমিত মালব্যর পুরনো মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বিজেপি বাংলা ভাষাকে বারবার অপমান করে। ওনাদের আইটি সেল প্রধান অমিত মালব্য বলেছিলেন, বাংলা নাকি বাংলাদেশিদের ভাষা! আজ নির্বাচনের মুখে প্রধানমন্ত্রী এসে ধ্রুপদী (Classical Language) স্বীকৃতির কথা বলছেন। ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা তো বাংলার নিজের সমৃদ্ধির জন্য অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিজেপি বাংলাকে সব সময় বঞ্চিত করেছে। নির্বাচন এগিয়ে এলেই প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা বারবার বাংলায় ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ করেন আর প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেন। তাঁরা বলছেন ‘মোদী কি গ্যারান্টি’, কিন্তু দেশের মানুষ জানে সেই গ্যারান্টি আসলে শূন্য। গ্যারান্টি মানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ‘কমিটমেন্ট’। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন- বিজেপি তাদের ১০ বছরের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে আসুক, আমরা আমাদের খতিয়ান দেব।”
‘জঙ্গলরাজ’ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘জঙ্গলরাজ’ মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া দেয় তৃণমূল। পার্থ ভৌমিক বলেন, “বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রেখে একের পর এক ট্রেনের উদ্বোধন করা আসলে মানুষকে ললিপপ দেখিয়ে প্রতারিত করা। জঙ্গলরাজের সংজ্ঞা কী? মোদীজি কি আইনশৃঙ্খলার কথা বলছেন? আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কোনো অরাজকতা নেই। যত অরাজকতা তৈরি করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো। উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে মহিলাদের ওপর যে নির্যাতন হয়, তার বিচার পাওয়া যায় না।’’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী বাংলায় এসে ভুলে যান তিনি কোথায় আছেন, ওনার সম্ভবত ‘অ্যালঝাইমার’ (Alzheimer) হয়েছে।’’
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও স্বাস্থ্যসাথী
সুকান্ত মজুমদারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর অঙ্ক বৃদ্ধি নিয়ে মন্তব্যকেও হাতিয়ার করেছে তৃণমূল। তাঁদের দাবি, বিজেপি যদি ক্ষমতায় এলে টাকা বাড়ানোর কথা বলে, তার মানে তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথকেই সঠিক বলে মেনে নিচ্ছে। নেতাদের প্রশ্ন, ‘‘দম থাকলে বিজেপি শাসিত রাজ্যে আগে এই প্রকল্প চালু করে দেখান।’’ আয়ুষ্মান ভারত প্রসঙ্গে তৃণমূলের স্পষ্ট বক্তব্য, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে রাজ্যের সবাই পরিষেবা পায়, কিন্তু আয়ুষ্মান কার্ডে সেই নিশ্চয়তা নেই।