পঠন পাঠন ভার্চুয়ালি হলে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় কেন? প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
সর্বোপরি, কোঠারি সহ বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৪ শতাংশেরও কম বরাদ্দ হয়েছে। শিক্ষাকে বর্তমান মোদি সরকার কতটা গুরুত্ব দিতে চায়, তা এর থেকেই স্পষ্ট।
Authored By:

উচ্চশিক্ষায় পঠন-পাঠননের ২০ শতাংশ ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে চালানোর নিদান দেওয়া হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতিতেই। তাহলে আবার পৃথক ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন কেন? কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার পর এই প্রশ্ন তুলছে শিক্ষামহল। কারও আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগ এবং পরিকাঠামো খাতে ব্যাপক ব্যয় সংকোচের জন্যই এই পরিকল্পনা। করোনার থাবা থেকে দেশকে রক্ষা করা কেন্দ্রীয় সরকারের কম্ম নয়, তা বুঝেই শিক্ষাকে পুরোপুরি ভার্চুয়াল পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ।
অর্থনীতির অধ্যাপক তথা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশিস সরকার এদিন বলেন, ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলভাব প্রোথিত রয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতিতেই। সেখানে কিন্তু সমস্ত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানের ক্ষেত্রেই ২০ শতাংশ ভার্চুয়াল পদ্ধতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সেটা করতে গেলে আবার আলাদা করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতা কোথায়? আসলে শিক্ষাকে ক্রমশ পণ্য হিসেবে গণ্য করার দিশাতেই কেন্দ্র হাঁটতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। দেবাশিসকবাবু একই সঙ্গে টেলিভিশনে শিক্ষাদানের বিষয়টি নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১২টি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে শিক্ষাদান তো হয়ই না, উল্টে বৈষম্য বাড়ে। কারণ, যোগাযোগ মন্ত্রকের রিপোর্টই বলছে, কেবল যোগাযোগ থাকা এলাকার সংখ্যা দেশে খুবই কম। এর ফলে একটা ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হবেই। পাশাপাশি যারা এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারবে, তাদের শিক্ষাটাও সম্পূর্ণ হবে না। সর্বোপরি, কোঠারি সহ বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৪ শতাংশেরও কম বরাদ্দ হয়েছে। শিক্ষাকে বর্তমান মোদি সরকার কতটা গুরুত্ব দিতে চায়, তা এর থেকেই স্পষ্ট।
অধ্যাপক সংগঠন ওয়েবকুপার সভানেত্রী কৃষ্ণকলি বসু বলেন, ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের কী যৌক্তিকতা জানি না। হয়তো এর ফলে আগামীদিনে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ এবং পরিকাঠামোয় কাটছাঁট করতে চায় সরকার। ক্যাম্পাসে যে ভাব ও মত বিনিময় হয়, তা সম্পূর্ণ উবে যাবে। বিরুদ্ধ স্বর থামাতে এই মত বিনিময়ের ব্যবস্থাই তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে। সর্বোপরি, করোনার প্রকোপ যে কেন্দ্র থামাতে পারবে না, তা বুঝেই আরও এসব দিকে ঝুঁকছে তারা। অনলাইন শিক্ষার বিরোধিতা করেছে অধ্যাপক সংগঠন জুটা। এর ফলে বহু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী শিক্ষার আঙিনা থেকে সরে যাবে বলে তাদের আশঙ্কা। অপর সংগঠন অ্যাবুটা বাজেট বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেভ এডুকেশন কমিটির বক্তব্য, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাটাই অনলাইনে চালানোর বাজেট হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসকরাও সন্তুষ্ট নন বাজেট নিয়ে। জেআইএস গ্রুপের এমডি তরণজিৎ সিং বলেন, যে সমস্ত ছাত্রছাত্রীর কাছে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন নেই, তারা কীভাবে এই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার শরিক হবে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফল নিয়েও সন্দিহান তিনিও। তার চেয়ে সামগ্রিক বাজেট বরাদ্দ বাড়লে আরও ভালো হত বলে তাঁর মত। রাইস গ্রুপের কর্ণধার সমিত রায় বলেন, গবেষণার মানোন্নয়নে সরকার যে ঘোষণা করেছে, তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলি সরকার স্পষ্ট করেনি বলে তাঁর অভিমত। প্র্যাক্সিস বিজনেস স্কুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা-অধিকর্তা চরণপ্রীত সিংয়ের মত, আইআইটি, ইউজিসি বা এআইসিটিই-এর মতো সংস্থাগুলির বাজেট বাড়লে ভালো হত। তবে শিক্ষায় সার্বিক বাজেট বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়টিকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। খড়্গপুরের গ্রিফিনস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান অভিষেক কুমার যাদব জানান, তিনি আশাহত। সরকার স্কুল ফি বাবদ আয়করে ছাড় বৃদ্ধি করবে বলেই তাঁর প্রত্যাশা ছিল। স্কিল ট্রেনিং নিয়ে সরকারি নীতিকে অবশ্য তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।