বিবিধ বিভাগে ফিরে যান

বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ উপেন্দ্রকিশোর

May 12, 2023 | 4 min read

সৌভিক রাজ

বাঙালির ছোটবেলা রায় পরিবারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ, রায়পরিবার মানেই শিশুসাহিত্য, যার শুরু উপেন্দ্রকিশোরের হাত ধরে। মুদ্রণ থেকেই তাদের শুরু, সাহায্য করেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের চেয়ে দু’বছরের বড়। দুজনের সখ্যতাও ছিল। ঠাকুরবাড়ির মাঘোৎসবে গানের সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর বহুবার বেহালায় সঙ্গত করেছেন। শিশুসাহিত্য বিষয়ে ঝোঁক ছিল ঠাকুর-পরিবারেরও। ঠাকুরবাড়ি থেকে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘বালক’। পরে ‘মুকুল’, ‘সখা ও সাথী’ নামেও কিছু শিশুপত্রিকা বেরোয়। পার্বনীর কথা ভুললে চলে না। কিন্তু ছবি বা ছাপার দিক থেকে সেগুলো মোটেই তেমন মনকাড়া ছিল না। তা নিয়ে কেউ মাথা না ঘামালেও উপেন্দ্রকিশোর সন্তুষ্ট হননি। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ছোটদের বিদেশি বইপত্র দেখেছেন, গবেষণা করেছেন কেমন করে সে রকম সুন্দর ছাপা, ছবি, পাঠ্য বিষয় আমাদের দেশে তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে। সকলের প্রতি কর্তব্য, ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষা, সকলকে নিয়ে চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, বনভোজন কিংবা ছুটি পেলেই সকলকে নিয়ে গিরিডি, চুনার, পুরী, দার্জিলিং সব কিছুই করেছেন। তারই সঙ্গে ১৮৯৫ সালের মধ্যে ছাপার কাজ এবং ছবি এনগ্রেভ করা নিয়ে তিনি এতটাই লেখাপড়া করেছিলেন, হাতেকলমে কাজ শুরু করার আত্মবিশ্বাসও তাঁর তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নিজের খরচে বিলেত থেকে যন্ত্রপাতি আনিয়ে তৈরি করলেন নিজস্ব ছাপাখানা ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’। শুরু করলেন হাফটোন ব্লক প্রিন্টিংয়ের কাজকর্ম। ভারতে সেই শুরু।

Upendrakishore Raychoudhury The Multifaceted Print Genius
‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’, ছবি সৌজন্যে- প্রিন্ট উইক ইন্ডিয়া

ছাপাখানা আর তার যন্ত্রপাতি রাখার সুবিধে না হওয়ায় তেরো নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিট থেকে রায় পরিবার উঠে এল সাত নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনে। সেখানে একটি ঘরে হল ছবি তোলার আর ছবি আঁকার স্টুডিও, একটি ঘরে প্রেস, অন্য ঘর আর বারান্দা মিলিয়ে সাজানো হল বাকি দরকারি যন্ত্রপাতি। একটা ছোট স্নানঘর হল তাঁর ডার্করুম। সেখানে তিনি চর্চা করে গেলেন হাফটোন ব্লকে ছাপার কাজ কেমন করে আরও ভাল, আরও উন্নত করে তোলা যায়। বিলিতি মুদ্রণ পদ্ধতি শিখলেন, সে সব সংশোধনের জন্যও অক্লান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করে চললেন।

ছাপার কাজে মগ্ন উপেন্দ্রকিশোর, ছবি সৌঃ- ডেইলি নিউজ রিল

বিলেতের বিখ্যাত মুদ্রণ এবং ফোটোটেকনিক সংক্রান্ত পত্রিকা ‘পেনরোজেজ পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল’-এ একের পর এক প্রবন্ধ পাঠাতে লাগলেন। সাহেবরা সে লেখা পড়ে বিস্মিত হলেন। বত্রিশ বছরের এক বাঙালি যুবকের এমন গভীর জ্ঞান, এমন সুন্দর ইংরেজি! তারা ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত উপেন্দ্রকিশোরের পাঠানো মোট ন’টি প্রবন্ধ ছাপেন। বিদেশ থেকে অনেকে তাঁর ছাপাখানার কাজ দেখার জন্যও আসতেন। মাঝারি মাপের এক ভাড়াবাড়িতে, নিজস্ব পুঁজি, কিছু যন্ত্রপাতি এবং অসামান্য প্রতিভা এই মূলধন নিয়েই অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি। তখনকার দিনে ছবি ছাপা হত কাঠের উপরে খোদাই করা উডকাট কিংবা ইস্পাতের পাতের সাহায্যে। এতে ছবি হত অস্পষ্ট আর মোটা।

উপেন্দ্রকিশোর জেনেছিলেন তামা বা দস্তার পাতে খোদাই করে ছবি ছাপলে তা আরও পরিষ্কার এবং স্পষ্ট হয়। হাফটোন এবং লাইন ব্লক নিয়ে অনেক পড়াশোনা করে উপেন্দ্রকিশোর যে সব উন্নত প্রণালী চালু করেছিলেন, তাতে সারা পৃথিবীর মুদ্রণশিল্প উপকৃত হয়েছিল। ছাপাখানা আরও বড় হওয়ায় ফের বাড়ি বদল। ১৯০০ সাল নাগাদ চলে এলেন ২২ নং সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে। সেই বাড়ির একতলায় হল ছাপাখানা, দোতলা তিনতলায় উপেন্দ্রকিশোরের পরিবার।

১৯১৩ সাল উপেন্দ্রকিশোরের দীর্ঘ দিনের স্বপ্নপূরণের শুরু। ছোটদের জন্য মাসিক পত্রিকা প্রকাশ সন্দেশের পথচলা শুরু। প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৩ সালে। বাংলায় ছোটদের লেখালিখির জগতে শুরু হল এক নতুন যুগ। প্রথম সংখ্যার সেই সন্দেশটিতে পাঠ্যবস্তুর বৈচিত্র যেমন ছিল, তেমনই ছিল ঝকঝকে ছাপা, উজ্জ্বল ছবি আর আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য লিখতে সন্দেশকে বেছে নিলেন দেশের বহু গুণী মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আরও অনেকে। সকলে বিনা পারিশ্রমিকে স্বেচ্ছায় লেখা দিতেন, সম্পাদকও আয়ব্যয়ের হিসেব মেলাতেন নিজের পকেট থেকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে। কিন্তু ছোটদের মুখ চেয়ে এ সবই তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন

সন্দেশ পত্রিকা, ছবি সৌঃ- বঙ্গদর্শন

উপেন্দ্রকিশোর মনে করতেন, রামায়ণ ও মহাভারত, এই দুই মহাকাব্যে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ চিন্তাধারাগুলো মিশে আছে। এগুলো সঙ্গে রাখতে পারলে আগামীর মঙ্গল। ছোটদের জন্য রামায়ণ, মহাভারত লিখলেন নতুন করে। আসল কাহিনি এক রইল, কিন্তু গল্প বলার সৌন্দর্যে চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে উঠল। ছোটদের মতো আদুরে হলেন না, বুড়োদের মতো গম্ভীর হলেন না, নীতিকথার উপরে জোর দিলেন না, খুব সুন্দর সাদা কালো রঙিন ছবি দিয়ে একেবারে ছোটদের মনের মতো করে তুললেন দুই মহাকাব্যকে।

উপেন্দ্রকিশোরের রামায়ণ ও মহাভারত, ছবি সৌঃ- অ্যামাজন

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পড়বে এবং আনন্দ করে শিখবে, শিশুসাহিত্যের কোথাও মাস্টারমশাইগিরি থাকবে না, এই ছিল উপেন্দ্রকিশোরেরনীতি। যথাসম্ভব ভাল কাগজ, ভাল রং, ছাপার কালি ব্যবহার করতেন, ভালবেসে নিষ্ঠার সঙ্গে ছবি আঁকতেন, কিন্তু ছাপা মনের মতো না হলেই ফেলে দিতেন। হাফটোন ব্লক তৈরিতে তাঁর যে গবেষণা, পুরোটাই জানিয়ে দিয়েছিলেন পেনরো‌জ কোম্পানিকে। তাঁর কাছেই কাজ শিখে গিয়ে কারা ইউ রায় অ্যান্ড সন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ছাপাখানা খুলে ফেলল, তা নিয়ে কোনও দিন মাথা ঘামাননি তিনি। জমিদারি থেকে প্রাপ্য অর্থে কখনও বিলাস করেননি, যা ব্যয় করেছেন সবই নিজস্ব গবেষণার উন্নতির জন্য। প্রয়োজনে জমি বন্ধক রেখেছেন, কিন্তু টাকা না এলে কী হবে, সে চিন্তা কখনও স্পর্শ করেনি তাঁকে।

শুধু ছোটদের রামায়ণ, মহাভারত, আকাশের কথা বা টুনটুনির বই নয়, তিনি নানা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধও লিখতেন। সঙ্গীত ও চিত্রকলার সম্পর্ক, গান বাজনার সাত সুর আর ছবি আঁকার সাত রঙের সাযুজ্য নিয়েও তাঁর প্রবন্ধ আছে। ফোটোগ্রাফি এবং প্রিন্টিং নিয়ে জটিল বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লিখেছেন, তেমনই আবার তাঁর কলম জন্ম দিয়েছে বেচারাম ও কেনারাম, গুপী গাইন ও বাঘা বাইন, ভূতের রাজাদের। তাঁর চিন্তার পরিধি ছিল বহুবিস্তৃত। সে ধারা সুকুমার ও সত্যজিতের মধ্যেও অক্ষত ছিল। আজ ২৮ শে বৈশাখ আজ ভূতের রাজার স্রষ্টার জন্মদিন।

টুনটুনির বই, ছবি সৌঃ- অ্যামাজন
গুপী গাইন ও বাঘা বাইন, ছবি সৌঃ- satyajitray.fandom.com
TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

#Upendrakishore Ray Chowdhury, #childrens literature

আরো দেখুন