বিবিধ বিভাগে ফিরে যান

বাংলার প্রাচীনতম দেবী নারায়ণী

May 27, 2023 | 2 min read

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি:

সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে
শরণ্যে ত্রম্বক্যে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে

অর্থাৎ যিনি সর্বমঙ্গলদায়িনী, সর্ব অর্থ সাধিনী, সেই শিবে ত্রম্বক্যে গৌরী নারায়ণীকে প্রণাম করি।

এখানে নারায়ণী শব্দের অর্থ হল নারায়ণের অংশসম্ভূতা। কিন্তু দেবকুলের সাথে এই নারায়ণী দেবীর কোন সম্পর্ক নেই। এখানে নারায়ণী, নারায়ণ বা বিষ্ণুর শক্তি বা বিষ্ণুর স্ত্রী নন। এই নারায়ণী বাংলার এক লৌকিক দেবী। সুন্দরবন অঞ্চলে এই দেবীর প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে দক্ষিণরায়ের পরেই এই দেবীকে মানা হয়। বাংলাদেশের বহু জায়গায় বর্ণ-ব্রাহ্মণরা এই পুজোর পৌরহিত্য করেন। তাঁরা নারায়ণীর পুজোয় বিভিন্ন সংস্কৃত মন্ত্রও ব্যবহার করেন। যেমন –

“সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্
চতুর্ভুজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্
রক্তবস্ত্রাপরিধানাং বালার্কসদৃশীতনুম্
রত্নেদ্বীপে মহাদ্বীপে সিংহাসন সমন্বিতে
প্রফুল্ল কমলারূঢ়াং ধ্যায়েতাং ভবসুন্দরীম্।”

এখানে আলোচ্য লৌকিকদেবী নারায়ণীর আকৃতি অনেকটা জগদ্ধাত্রীর মতন। মাথায় মুকুট, দীর্ঘ এলায়িত কেশ ও গাত্রবর্ণ রক্তাভহরিদ্রা, ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা কোথাও আবার দ্বিভূজাও দেখা যায়। তিনি সাধারণতঃ রক্তবস্ত্র পরিহিতা। তাঁর হাতে খড়্গ ও খটোক দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেবীর বাহন সিংহ, তবে অরণ্যময় অঞ্চলে কিছু জায়গায় ব্যাঘ্রবাহিনী নারায়ণীও দেখতে পাওয়া যায়। কিছু জায়গায় এই দেবীর প্রতিমা বিচিত্র ধরণের। যেমন – সিংহ বা বাঘের উপরে শায়িত শিব, তাঁর বুকের উপরে নারায়ণী কমলাসনে উপবিষ্ট থাকেন, মাথায় মুকুট থাকে না, দেবীর মাথার উপরে কেশগুলি কুণ্ডলি করে স্থাপিত থাকে। সেই সব মূর্তিতে দেবীর চোখ মুখের ভাব যেন তীব্র, তাঁকে অভিচারিকা দেবী বলে মনে হয়।

এই দেবীর পুজোয় সর্বত্র ব্রাহ্মণ্যবিধান অনুসৃত হয়। কোনও বলির কোন প্ৰথা নেই। শনিবার ও মঙ্গলবার এবং প্রতি পূর্ণিমার দিনে দেবীর পূজা হয়। কিন্তু খাড়ি’ নামক পল্লীর একটি মাত্র মন্দিরে দেবীর নিত্যপূজা হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে বা মাঘ মাসের প্রথম দিনে নারায়ণীর বিশেষ পুজো হয় । কিন্তু সেই পূজা একটু ভিন্ন রকমের হয়। দেবীর বারা (ঘট) পূজায়’ সর্বত্র দুটি ঘট একসঙ্গে থাকে। ব্রাহ্মণদের মতে,, সেই যুগ্ম-বারার একটি হলেন ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণরায়’ এবং অপরটি তাঁর মা নারায়ণী। গভীর রাত্রে মশাল জ্বালিয়ে ঢাক ঢোল বাদ্যসহ বনাঞ্চলে পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সেই পুজোয় মদ ও মাংস নৈবেদ্যরূপে দেবীকে দেবার রীতি আছে।

কথিত আছে, বিষ্ণুধর্মালম্বী সেন রাজাদের রাজত্বকালে এই দেবীর আদি বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে নিরামিষাশী হয়েছিলেন। এককালে নারায়ণী দেবীর যে বিশেষ প্রাধান্য ছিল সেটা বোঝা যায়। তবে বর্তমানে এই দেবীর ততটা প্রাধান্য নেই। গবেষকরা মনে করেন যে, নারায়ণী পুজোর উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার খাড়ি নামক স্থানে। সেখানে এই দেবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও বিখ্যাত মন্দির বা পাকা থান আজও দেখতে পাওয়া যায়। ‘ডাকার্ণব’ গ্রন্থে তান্ত্রিক দেবীদের তালিকায় নারায়ণীর নাম পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:-

১- বাংলার লোকদেবতা ও সমাজসংস্কৃতি, দেবব্রত নস্কর, আনন্দ পাবলিশার্স।
২- বাংলার লৌকিক দেবতা, গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, দে’জ পাবলিশিং।
৩- বাংলার লোকসংস্কৃতি, ড. আদিত্য মুখোপাধ্যায়, অমর ভারতী।

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

#West Bengal, #Goddess Narayani, #Narayani Devi

আরো দেখুন