বিবিধ বিভাগে ফিরে যান

শিবরাত্রিতে জমজমাট বাংলার এই মেলাগুলি, জেনে নিন কোথায়

March 8, 2024 | 3 min read

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি: ১২ মাসে ১৩ পার্বন। তার সঙ্গে যোগ মেলা। মেলা ছাড়া বাঙালির উৎসব যেন পরিপূর্ন হয়না। তাই গাজন বা চরক, দুর্গাপুজো, এমনকি কার্তিক পুজোতেও বাংলার গ্রামেগঞ্জে বসে বাঙালির মেলা। সেই হিসেবে শিবরাত্রিতে যে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মেলা বসবে, এটাই স্বাভাবিক।

মালদহের ভালুকাবাজারে শিবরাত্রি মেলা

মালদহে হরিশ্চন্দ্রপুরের ভালুকাবাজারে শিবরাত্রি মেলা শতাব্দী প্রাচীন। ভালুকাবাজারের এই মেলা চলে ১০ দিন ধরে। ফুলহারের পাড়ে ভালুকাবাজার এলাকার ওই মেলায় প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ আসেন মালদহ ও দুই দিনাজপুর ছাড়াও লাগোয়া বিহার, ঝাড়খন্ড থেকেও। মূল মেলা স্থানীয় একটি লিচুবাগানে বসলেও গোটা ভালুকাবাজার জুড়েই দোকানপাট বসে। এখানকার মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কাঠের আসবাবপত্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে কাঠের আসবাবপত্র নিয়ে মেলায় হাজির হন ।

১০৯ বছর আগে ভালুকার মেলার সূচনা করেছিলেন স্থানীয় জমিদার প্রয়াত হরিমোহন মিশ্র । নদীর তীরে ৮০ বিঘা জমির উপর বিশাল মন্দিরও তৈরি করেছিলেন। শোনা যায়, কাশী থেকে শিবলিঙ্গ-সহ দেবদেবীর বিগ্রহ নিয়ে এসে ওই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মন্দিরটি ১৯৬৪ সালে নদী ভাঙনে তলিয়ে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারাই ফের নতুন মন্দির গড়ে পুজো শুরু করেন ।

চাঁচলের হাতিন্দায় শিবরাত্রি মেলা

হাতিন্দায় শিবরাত্রি মেলা

কথিত আছে বহু শতাব্দী আগে চাঁচল রাজার অনুমতিতে কাশীধাম থেকে শিবলিঙ্গ নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেখানকার মন্দিরে। চাঁচল থেকে চার কিলোমিটার দূরে এই হাতিন্দার শিবরাত্রি মেলার সঙ্গে তাই জড়িয়ে রয়েছে চাঁচল রাজার নাম। এই মেলায় ভিড় জমান গোটা মহকুমার বাসিন্দারা। চাঁচলের মেলাটি দু’দিনের।

বক্রেশ্বর ধামের শিবরাত্রি মেলা

বক্রেশ্বর শিবরাত্রি মেলা

বীরভূমের বক্রেশ্বর ধামে শিব ভৈরবনাথ নামে প্রতিষ্ঠিত। পাশেই রয়েছে মহিষমর্দিনীর সতী পীঠ । রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন । মেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। সরকারিভাবে তিনদিনের মেলা হলেও চলে এক সপ্তাহ । লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন। এই মেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে ভোলানাথের পাঁচটি মূর্তি রয়েছে। শিবরাত্রির দিন মূর্তিগুলি বের করা হয় । ওইদিন মূর্তিগুলি নিয়ে বক্রেশ্বর গ্রাম প্রদক্ষিণ করা হয়। তারপর পর শুরু হয় শিবরাত্রির পুজো।তাই মেলাকে ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকছে ।

কথিত আছে, মহাভারতের সময়কাল থেকে এই মেলা চলে আসছে । অষ্টবক্র মুনি নাকি তাঁর শারীরিক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এই বক্রেশ্বর ধামে এসেছিলেন । সেখানেই বাবা ভোলানাথের দর্শন পেয়ে তিনি মুক্তি লাভ করেন । তারপরেই বাবা ভোলানাথকে ভৈরবনাথ নামে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় । সেই থেকেই মেলা চলে আসছে ।

জল্পেশের শিবরাত্রির মেলা

জল্পেশের শিবরাত্রির মেলা

একান্ন পীঠের অন্যতম, জল্পেশ মন্দিরের অবস্থান ময়নাগুড়ি থেকে আরও ৭-৮ কিলোমিটার দূরে জরদা নদীর ধারে। এখানে ভৈরব জল্পীশ তথা জল্পেশ এবং সতীপীঠ ভৈরবী ভ্রমরী দেবীর। পুরাণ মতে এই তীর্থ হাজার বছরেরও প্রাচীন। প্রাগজ্যোতিশপুরের (অসম) রাজা জল্পেশ এই মন্দির তৈরি করান বলে, মন্দির ও দেবতার নামও জল্পেশ। যদিও পাথুরে প্রমাণে তার সাক্ষ্য মেলে না। ঐতিহাসিকদের মতে কোচবিহারের রাজারা সপ্তদশ শতকে এই মন্দির তৈরি করান। মন্দিরের মতো মন্দিরের শিবমূর্তিটিও রহস্যাবৃত। ঈষৎ সবজেটে বা সাদা শিবলিঙ্গের খুব অল্প অংশই দেখা যায়। মসৃণ নয়, খাঁজযুক্ত।

মনে করা হয় সপ্তদশ শতকে মন্দির তৈরির পর থেকেই মেলার সূচনা। সেই দিক থেকে মেলাটি গোটা রাজ্যেরই প্রাচীন মেলাগুলির অন্যতম। এক সময় মন্দিরের আয়ের অন্যতম পথ ছিল জল্পেশ মেলা। ডুয়ার্স যখন ভূটানের অংশ ছিল, তখন ময়নাগুড়িকে কেন্দ্র করেই পাহাড় ও সমতলের ব্যবসা হত। ফলে এই মেলার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অসীম। বর্তমানেও মেলার গুরুত্ব যথেষ্ট। মেলায় থাকে বিভিন্ন সরকারি দফতরের প্রদর্শনী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি। বর্তমানে এই মেলার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে কৃষি মেলা। প্রায় পাঁচ-ছশো দোকান বসে মেলায়। উল্লেখযোগ্য পণ্যসামগ্রীর মধ্যে লোহা, কাঠ, কাঁসা, পিতল, পাথর আর মাটির তৈরি জিনিসপত্রই বেশি। এ ছাড়া বেত-বাঁশের সামগ্রী তো আছেই। আর আছে খাবারের দোকান।

বাঁকুড়ার বিহারীনাথ পাহাড়ে শিবরাত্রির মেলা

বিহারীনাথ পাহাড়ে শিবরাত্রির মেলা

বিহারীনাথ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার উচ্চতম পাহাড়। এই অঞ্চলটি জেলার অন্যতম গভীর বনাঞ্চলও বটে। পাহাড়ের নীচেই রয়েছে বিখ্যাত শিব মন্দির। বিহারীনাথ ধাম নামেই এই মন্দির প্রসিদ্ধ। এখানে শিবের নাম বিহারীনাথ এবং তাঁর নামেই এই পাহাড়ের নামকরণ। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে এই বিহারীনাথের শিবলিঙ্গটি এখানের রাজা স্বপ্নাদেশে পেয়েছিলেন। মন্দির সংলগ্ন পুকুরটিকে স্থানীয় মানুষ অত্যন্ত পবিত্র বলেই মনে করেন। এই প্রাচীন শিবের মন্দিরে শিবরাত্রি উপলক্ষে মেলা বসে আর সেই সময়ে ভক্তসমাগমও হয় প্রচুর।

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

#West Bengal, #Maha Shivaratri, #Maha Shivratri 2024

আরো দেখুন