ধর্মরাজ: প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে রাঢ় বঙ্গের গ্রামদেবতার পুজো
ধর্মরাজ বা ধরম পুজো মূলত পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বঙ্গীয় জেলা যেমন বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চলের গ্রামীণ তথা প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত আছে।
Authored By:

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি: ধর্মরাজ পুজো প্রধানত গ্রামের পুজো বা গ্রাম্য দেবতা। এই পুজোর পূজা পদ্ধতিও গ্রামীণ ও প্রাচীন। জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই পুজো হয়। মোটামুটি ৫ দিন ধরে চলে এই পুজো। ধর্মরাজ বা ধরম পুজো মূলত পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বঙ্গীয় জেলা যেমন বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চলের গ্রামীণ তথা প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত আছে।
এই পুজো প্রধানত রাঢ় বঙ্গের আঞ্চলিক পুজো। প্রাচীন অনার্য ও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মানুষরা এই পুজোয় প্রধানত অংশগ্রহণ করতেন। অতীতে উচ্চবর্ণের মানুষের থেকে সংখ্যায় নিন্মবর্ণের মানুষ বেশি ছিলেন। ব্রাহ্মণ্য আচার অনুষ্ঠানে এই গোষ্ঠীর অধিকার ছিল না তেমন ভাবে এবং অন্যান্য অনেক পুজোতেই এরা অংশ নিতে পারতেন না। তাই ক্রমে এই ধর্মরাজ ঠাকুর এই নিম্নবর্গের মানুষের ঠাকুর হয়ে ওঠেন। এই ঠাকুরের উপর ব্রাহ্মণদের অধিকার বিশেষ ছিল না। তথাকথিত নিন্ম বর্গীয় যেমন বাউড়ি, হাড়ি, বাগদি, ডোম, ভল্লা, চামার ইত্যাদি বর্ণের মানুষের এই পুজোয় বিশেষ ভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। ধর্মরাজের সেবাইতদের বলা হয় ‘দেয়াসি’।

ধর্মরাজ ঠাকুরকে মূলত শিব, বিষ্ণু ও সূর্য দেবের ধারক বাহক হিসাবে কল্পনা করা হয়। যদিও এই ধারণা নিয়ে দ্বিমত আছে। ধর্মরাজ ঠাকুরের নির্দিষ্ট কোনও মূর্তি হয়না। সিঁদুর-মাখানো নির্দিষ্ট আকারবিহীন প্রস্তরখণ্ডে ধর্মরাজের পুজো করা হয়। প্রস্তরখণ্ডটি কোথাও কোথাও গাছের তলায় বা উন্মক্ত জায়গায় রাখা হয় যা ধরম ঠাকুরের থান বা ধর্মরাজ-তলা বলা হয়। আবার অনেক গ্রামেই ধর্মরাজ ঠাকুরের মন্দির থাকে এবং দেবতা সেখানেই নিত্য পূজিত হন। মন্দিরে ধর্মরাজের সঙ্গে লৌহশলাকা যুক্ত একটি কাঠের পাটাতনকে রাখা হয় যা বাণেশ্বর নামে পরিচিত। ধর্মরাজের গ্রাম পরিক্রমা করার রীতিকে স্থানীয় ভাষায় ‘বারাম’ বলা হয়। পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ধর্মরাজ পূজা পালনকারী ভক্তরা ‘ভক্তা’ নামে পরিচিত।

ভক্তাদের লোটন, কাঁটা লোটন, ডণ্ডি দেওয়া, দেহের বিভিন্ন অংশ ছুঁচ দ্বারা ফোঁড়া যা বাণফোঁড়া নামে পরিচিত ইত্যাদি ধর্মরাজ পূজার বিশেষ অংশ। ধর্মরাজের বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন আসানসোলের ডামরা গ্রামের মন্দিরে ধর্মরাজের সঙ্গে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বুড়ো রায় ও বাঁকু্ড়া রায়। জামুরিয়া ব্লকের অন্তর্ভূক্ত চিচুড়িয়া গ্রামে এই দেবতা ‘বুড়ো রায়’ নামে পরিচিত। ওই গ্রামেরই বাউরির সম্প্রদায়ের ধর্মরাজ দেবতা ‘কালা রায়’ নামে পরিচিত। পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ধর্মরাজ সম্বন্ধে কয়েকটি ছড়া প্রচলিত রয়েছে।
যেমন –
‘চল বাবার গাজনে ধর্মরাজে
আঁকড়া তলে বাঁকড়া রায় হে।’
অন্য একটি প্রচলিত ছন্দছড়া-
‘গাজনেতে ধর্মরাজে অসংখ্য প্রণাম
প্রণাম আমি বুড়া রায়ে গাজনেতে ধাম।
সুন্দ রায় কালা রায় বানেশ্বর কালী
স্বরুপ নারায়ণ বাঁকুড়া রায় বন্দীস কলী।’
ধর্মরাজকে নিয়ে গ্রাম পরিক্রমা করার সময় এই প্রচলিত ছড়াগুলি ভক্তাদের দ্বারা উচ্চারিত হয়।
ধর্মরাজ ঠাকুরের বাহন হল ঘোড়া, যা কাঠের বা পোড়া মাটির হয়ে থাকে। অনেক মানুষ মনোবাঞ্ছা পূরণের আশায় ঠাকুরের উদ্দেশ্যে ঘোড়া মানত বা মানসিক করেন।

এই পুজোয় অনেক ছোটখাটো আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল ‘ভক্ত’ হওয়া। অনেকেই এই ভক্ত হওয়ার মানত বা মানসিক করে থাকেন। এই ভক্ত হওয়ার পর্যায়কালটি খুবই কঠিন সংযম ও নিয়ম নিষ্ঠার মধ্যে পালন করতে হয়। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে আরো অনেক আনুষঙ্গিক নিয়ম-নীতি পালন করতে হয়। তারমধ্যেই একটি হচ্ছে ‘কামান’ বা ‘কামানো’ প্রথা পালন করা যা অনেকটাই অন্তেষ্টিক্রিয়া সৎকার্যের অনুরূপ।

পুজোর ৫ দিনের মধ্যে প্রথম তিনদিন ছোটঘাট পুজো, মেজঘাট পুজো এবং বড়ঘাট পুজো হয়, যেখানে বাণেশ্বরের (যা শিবেরই রূপ)পুজো হয়। এটি একটি লম্বা কাঠের বিশেষ আকৃতির অংশ। চর্তুথ দিন হয় মুক্তস্নান এবং পঞ্চম দিন ভাঁড়াল ভরা।
শেষের দুই দিন অনেক আচার অনুষ্ঠান হয়। জলন্ত আঙ্গারে মধ্যে হাঁটা, ভক্তগণের পিঠের উপর দিয়ে ঠাকুর নিয়ে যাওয়া, মাথায় হাঁড়ি নিয়ে যাওয়া, ভর আসা ইত্যাদি। এই প্রথাগুলি অনেকটাই গাজন বা চরকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বীরভূমের বিভিন্ন গ্রামে এখনও এই পুজোকে ঘিরে মানুষের মধ্যে উন্মাদনা আজও সমান ভাবে বজায় আছে।