‘কর্মভূমি’ থেকেই ছাব্বিশের রণডঙ্কা, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১-এ ৩১-এর ডাক দিয়ে প্রচার শুরু অভিষেকের

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৬:৫৫: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন কড়া নাড়ছে দরজায়। হাতে আর মাত্র কয়েক মাস। সেই ভোটযুদ্ধকে ‘পাখির চোখ’ করে শুক্রবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর থেকে নির্বাচনী প্রচারের আনুষ্ঠানিক সূচনা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। একমাসব্যাপী ‘আবার জিতবে বাংলা’ কর্মসূচির প্রথম দিনে বারুইপুরের সাগরসংঘের মাঠে ‘রণ সংকল্প সভা’য় দাঁড়িয়ে কর্মীদের চড়া সুরে ‘ভোকাল টনিক’ দিলেন তিনি। সেই সঙ্গে বেঁধে দিলেন কঠিন টার্গেট, জেলার ৩১টি আসনের মধ্যে ৩১টিতেই জোড়াফুল ফোটাতে হবে।
তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা। তবুও কেন এখান থেকেই প্রচার শুরু, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিষেক নিজেই। মঞ্চে উঠে হাঁটু গেড়ে বসে জনতাকে প্রণাম জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যখন কোনও শুভ কাজে যাই, বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিই। কালীঘাট আমার জন্মভূমি হলে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বারুইপুর আমার কর্মভূমি। এই মাটিতেই যেন আমার মৃত্যু হয়। তাই আপনাদের আশীর্বাদ ও স্নেহকে পাথেয় করেই ছাব্বিশের লড়াই শুরু করলাম।”
আগামী কয়েকদিন তিনি টানা কর্মসূচীতে থাকবেন বলে জানান। অভিষেক বলেন, “আগামীকাল আমি আলিপুরদুয়ার যাব। ফিরে এসে ৬ তারিখ বীরভূম, ৭ তারিখ উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, ৮ তারিখ মালদা এবং তারপর ৯ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত টানা কর্মসূচি চলবে। আমি কথা দিচ্ছি, আমার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়াব।”
বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ এবং ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ। অভিষেকের অভিযোগ, “মানুষকে ভাতে মারতে চাইছে মোদী সরকার। শুধু ১০০ দিনের টাকা বা আবাস যোজনা বন্ধ করেই এরা ক্ষান্ত হয়নি, এসআইআর-এর নামে মানুষের মৌলিক অধিকার কাড়তে চাইছে।”
তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, “এসআইআর-এর কারণে নোটিশ পেয়ে আতঙ্কে প্রায় ৫৬ জন মানুষ মারা গেছেন। এর দায় কার?” নোটবন্দির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২০১৬ সালে নোটবন্দির জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, আর ২০২৬-এ এসআইআর-এর জন্য লাইনে দাঁড় করিয়েছে। আগামী নির্বাচনে ইভিএম-এ এমনভাবে বোতাম টিপবেন যাতে যারা আপনাকে নোটিশ পাঠিয়ে আনম্যাপ করেছে, তাদের বাংলার ম্যাপ থেকে চিরতরে বিদায় দেওয়া যায়।”
বিজেপিকে ‘বাংলা বিরোধী’ আখ্যা দিতে গিয়ে মহারাষ্ট্রের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন অভিষেক। তিনি জানান, বালুরঘাটের দুই যুবক-অসিত সরকার ও গৌতম বর্মন (যিনি আবার বিজেপির বুথ সভাপতি) শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার অপরাধে মহারাষ্ট্রে জেল খেটেছেন। অভিষেকের কটাক্ষ, “বিজেপির সাংসদ নিজের দলের বুথ সভাপতিকেও বাঁচাতে পারেননি। আমরা তাদের আইনি লড়াই লড়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। যে বিজেপি নিজের কর্মীদের রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার মানুষকে কী রক্ষা করবে?”
কর্মসংস্থান নিয়ে মোদী সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন অভিষেক। তিনি বলেন, “বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি ছিল। ১১ বছরে ২২ কোটি চাকরি হওয়ার কথা। মোদী সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে গুজরাট বা উত্তরপ্রদেশের একটি বিধানসভায় ৫০০০ চাকরি দিয়েছে, তবে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব।” পাশাপাশি গত ৭ বছরে বাংলা থেকে কেন্দ্র ৬ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেলেও রাজ্যের পাওনা মেটায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিনের সভা থেকে অভিষেক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, গত বিধানসভায় ভাঙড় হাতছাড়া হয়েছিল, কিন্তু এবার কোনও ছাড় নেই। ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুর ও সুন্দরবন সাংগঠনিক জেলার নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে তাঁর কড়া বার্তা, “ছাব্বিশে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সব কটি আসন জিততে হবে। একত্রিশে ৩১। ভাঙড়ও এবার আমাদের জিততে হবে। শুধু তাই নয়, কোনও আসনে যেন জয়ের ব্যবধান ৫০ হাজারের নিচে না নামে।”
এদিনের সভার অন্যতম চমক ছিল মঞ্চের সামনের র্যাম্প। সেই র্যাম্পে অভিষেক হাঁটালেন মনিরুল মোল্লা, হরেকৃষ্ণ গিরি এবং মায়া দাস নামের তিন ব্যক্তিকে। অভিষেকের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের এসআইআর (SIR) তালিকায় এঁদের ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। জীবিত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে কমিশন ও অমিত শাহকে (Amit Shah) তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, “কমিশন যাঁদের মৃত বলেছে, তাঁরা আজ এখানে দাঁড়িয়ে। ভ্যানিশ কুমাররা তৈরি থাকুন, জ্ঞানেশ কুমার, অমিত শাহ, সবাই ভোটের জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাবেন। আমরা একজন জ্যান্ত মানুষের নামও ভোটার তালিকা থেকে কাটতে দেব না।”
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা থেকে শুরু করে ‘চিকেন প্যাটিস’ বিতর্ক- বিজেপিকে (BJP) এদিন সবদিক থেকে আক্রমণ করেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তিনি বলেন, “গত সাত বছরে বাংলা থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বিজেপি তুলে নিয়ে গিয়েছে, অথচ গরিবের আবাসের টাকা বা ১০০ দিনের কাজের টাকা দেয়নি।” ব্রিগেডে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে খাবার বিতর্ক নিয়ে তাঁর মন্তব্য, “কে কী খাবে বা পরবে, সেটা কি বিজেপির দালালরা ঠিক করবে? আমাদের সংস্কৃতিকে ওরা বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেয়। এর জবাব বাংলা দেবে।”
পাশাপাশি, মহারাষ্ট্রে বাংলায় কথা বলার কারণে গ্রেপ্তারির অভিযোগে বালুরঘাটের বিজেপি বুথ সভাপতি হেনস্থার শিকার হন। অভিষেকের অভিযোগ, সুকান্ত মজুমদার একবারও ফোন করে সাহায্য করেননি। তৃণমূলই উদ্যোগ নিয়ে সেই বুথ সভাপতিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। অভিষেকের বক্তব্যে উঠে আসে তাঁর কটাক্ষ- ‘‘নিজেদের বুথ সভাপতিকে যে বিজেপি রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার মানুষকে কী ভাবে রক্ষা করবে? এরা শুধু কাড়তে জানে, দিতে জানে না।’’ এর পাশাপাশি অভিষেক সভামঞ্চে শোনান শুভেন্দুর বক্তব্যের অডিয়ো (যার সত্যতা যাচাই করেনি দৃষ্টিভঙ্গি) । সেখানে শুভেন্দুকে বলতে শোনা যায়, ‘‘এর চেয়ে তো ইউনূসের সরকার ভাল চলছে।’’ এ প্রসঙ্গে অভিষেকের তীব্র আক্রমণ, ‘‘বাংলাদেশে নৃশংস ভাবে দীপু দাসকে মারা হয়েছে। বিজেপির নেতা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে সেখানে ভাল ভাবে সরকার চলছে। এরা নিজেদের হিন্দুদের রক্ষাকর্তা বলে।’’
বক্তব্যের শেষে অভিষেক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন বিরোধীদের দিকে। তিনি বলেন, “বিজেপি যদি প্রমাণ করতে পারে যে তারা একটা বিধানসভায় পাঁচ হাজার চাকরি দিয়েছে, তবে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব।” ২০২৬-এ তৃণমূলের ভোট ও আসন সংখ্যা ২০২১-এর থেকেও বাড়বে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সভার শেষে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করতে অভিষেক বলেন, “তৃণমূল দলটা বিশুদ্ধ লোহার মতো। যত আঘাত করবেন, তত শক্তিশালী হবে।” ২০২৬-এর নির্বাচনকে ‘শিক্ষা দেওয়ার নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রতিটি আসনে জয়ের ব্যবধান যেন বিপুল হয়। বাংলা বিরোধীদের গণতান্ত্রিকভাবে জবাব দিতে হবে।”
এদিন বারুইপুরের সভায় জনসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। অভিষেকের দাবি, রাস্তার দুপাশে যা মানুষ ছিল, তার এক-তৃতীয়াংশ দিল্লি গেলে অমিত শাহরা ভেসে যাবেন। ২০২৬-এর আগে এই সভা তৃণমূল কর্মীদের মনোবল অনেকটাই বাড়িয়ে দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।