“আলিপুরদুয়ারে পাঁচে পাঁচ করতে হবে”, ২৬শের টার্গেট বেঁধে দিলেন অভিষেক

January 3, 2026 | 5 min read

নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৪.৩০: উত্তরবঙ্গের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার বার্তা আগেই দিয়েছিলেন। এবার আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) জনসভায় চা বাগানের শ্রমিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা থেকে শুরু করে নোটবন্দি, একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রকে তোপ দাগার পাশাপাশি, হেরে যাওয়া কেন্দ্রেও যে তৃণমূল উন্নয়ন থামায়নি, সেই খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি।

শনিবার আলিপুরদুয়ারের জনসভায় অভিষেক অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাতে মারছে কেন্দ্র। তিনি বলেন, “গত ৫ বছর ধরে বিজেপি যে ভাবে বাংলার মানুষকে হয়রানি করছে, কোচবিহার থেকে হাওড়া, শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা- সর্বত্র ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে রেখেছে।”

উন্নয়নের প্রশ্নে তৃণমূল এবং বিজেপির (BJP) ফারাক বোঝাতে গিয়ে আলিপুরদুয়ারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন অভিষেক। তিনি বলেন, “আমি সকলকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, যেখানে দল হেরে যায়, সেখানে কি উন্নয়ন থামিয়ে দেবে? আলিপুরদুয়ারে তৃণমূল হেরেছে। এখানকার সাংসদ, বিধায়ক বিজেপির। তাঁরা ২০১৯ সালেও ছিলেন। কিন্তু গত ৫ বছরে কি লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়েছে? আমরা আলিপুরদুয়ারে হেরেছি, কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করিনি। এক এক বিধানসভায় ২৫ কোটি টাকা খরচ হয় মাসে।”

অভিষেক বলেন, “২০২১ সালে আলিপুরদুয়ারের পাঁচটি বিধানসভা আসনেই তৃণমূল পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তার জন্য কি এখানকার উন্নয়ন থেমে থাকা উচিত? গত ৫ বছরে আলিপুরদুয়ারের মা-বোনেদের জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে রাজ্য সরকার প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। আমরা হারলেও মানুষের পাশে আছি, আর বিজেপি হেরেছে বলে বাংলার হকের টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। এটাই বিজেপি আর তৃণমূলের পার্থক্য।”

চা বাগানের শ্রমিকদের বঞ্চনা নিয়েও এদিন কেন্দ্রকে তুলোধোনা করেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তিনি বলেন, “২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ৭টি চা বাগান অধিগ্রহণ করবে কেন্দ্র। আজ ১০ বছর কেটে গেছে, কিছুই হয়নি। উল্টে চা শ্রমিকদের পিএফ-এর টাকা আটকে রাখা হচ্ছে, বাগানগুলোতে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা।” তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি সাংসদ বা বিধায়করা গত ১০ বছরে চা শ্রমিকদের পিএফ বা পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে সংসদে একটিও চিঠি দেননি।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং আধার কার্ড নিষ্ক্রিয়করণ প্রসঙ্গেও এদিন সরব হন অভিষেক। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এটাকে আমি ‘ভ্যানিশ কুমারের ম্যাজিক’ বলি।” তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন, এনআরসি বা আধার বাতিলের নামে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “এই মোদী সরকার নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে ১০ বছর আগে সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিলেন। দেখা গেল কালোধন আরও বেড়ে গেল। ১০ বছর পর আবার মানুষকে লাইনে দাঁড় করালেন। আগে জনতা সরকার গড়তেন, আর এখন সরকার ঠিক করছে ভোটার কে হবেন।”

আসন্ন নির্বাচনকে ‘প্রতিবাদের ভোট’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, “এই নির্বাচন শুধুমাত্র সরকার গড়ার নয়, এই নির্বাচন বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার নির্বাচন। যারা বাংলার টাকা আটকে রেখেছে, যারা শ্রমিকদের ভাতের থালায় আঘাত করেছে, তাদের ইভিএম-এ বোতাম টিপে যোগ্য জবাব দিন।”

উত্তরবঙ্গের মানুষের বিপদে আপদে কারা পাশে থাকে, সেই প্রশ্নও তোলেন অভিষেক। বন্যা পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “উত্তরবঙ্গে বন্যার সময়ে বিজেপির কে এসেছিলেন? দিদি এসেছিলেন। বাড়ি করেছেন, সেতু করেছেন। এবার ভোট আসছে, তাই আবার বিজেপির নেতারা আসবেন।” মালবাজারের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “যখন কোনও ভোট ছিল না, ২০২২ সালেও মালবাজারে আমরা এসেছি। কারণ রাজনীতি শুধু ভোটের সময়ের জন্য নয়। জনসেবা করতে এসেছেন যখন, ২৪ ঘণ্টা থাকতে হবে।”

নিজের প্রতিশ্রুতির বিষয়েও এদিন অনড় মনোভাব দেখান অভিষেক। চা শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “আমি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সব পূরণ করব। যে কথা আমি বলি, আমৃত্যু সেই কথা রাখার চেষ্টা করি।”

বিজেপিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, “বিজেপির সাংসদ এবং সাপ একই জিনিস। বাড়ির পিছনে একটা, দুটো সাপ ছেড়ে দিন। সাপ সাপই থাকে। আপনার দুধ-কলা খেয়ে আপনাকেই ছোবল মারবে। তাই এ বার সাপ পুষবেন না। তৃণমূলকে সুযোগ দিন। যদি আপনাদের জন্য কাজ করতে না পারি, পরের বারই সরিয়ে দেবেন।”

দিল্লির নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। অভিষেক বলেন, “আমরা দিল্লির নির্বাচন কমিশনের অফিসে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তথ্য দিন। সকলে জানুক সমস্ত তথ্য। জ্ঞানেশ কুমার কে জানেন? জাদুকর। উনি জ্যান্ত মানুষকে মেরে দিতে পারেন, মরা মানুষকে হাঁটাতে পারেন। উনি ভ্যানিশ কুমার। এবার আপনারা ম্যাজিক করে বিজেপিকে হটিয়ে দিন।”

এর পাশাপাশি তিনি দু’টি রাজনৈতিক মডেলের তুলনা টেনে বলেন, “তৃণমূলের মডেল হল, যদি আপনারা না-ও জেতান, তাদের কাজ চলতে থাকবে। উন্নয়ন থমকে থাকবে না। কিন্তু বিজেপি? উন্নয়ন থামিয়ে দেবে।”

আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়েও বিজেপির অভিযোগের জবাব দেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, “ওরা বলেন পশ্চিমবঙ্গে এই পরিষেবা দেওয়া হয় না। শুনুন, বাড়িতে একটা রঙিন টিভি থাকলে ওই প্রকল্পের সুবিধা মেলে না। কিন্তু স্বাস্থ্যসাথীতে এই সবের দরকার হয় না। স্বাস্থ্যসাথীতে রাজ্যের ১ কোটি মানুষ সুবিধা পাবেন। কোটি কোটি মানুষ বঞ্চিত হবেন।”

সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, “এখন এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল যারা, তারা চিকেন রোল বিক্রি করলে মারধর করেন, চিকেন প্যাটিস বিক্রি করলে মারধর করা হয়। কোথায় মারছে? যেখানে গীতাপাঠ হয়। আমি হিন্দু। এই ধর্ম কাউকে আক্রমণ করতে শেখায় না। মানবতার চেয়ে বড় কোনও ধর্ম কি হতে পারে! ভাবুন, এরা সরকারে এলে কী করতে পারে! কে কী খাবেন, পরবেন, যাবেন- সব এরা ঠিক করবে। এটা গণতন্ত্র?”

মধ্যপ্রদেশে ‘বিষাক্ত’ পানীয় জল পান করে মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি শাসিত সরকারকে নিশানা করে অভিষেক বলেন, “যারা পানীয় জল দিতে পারে না, তারা মাথার ছাদ দেবে আপনাদের?”

তিনি আরও বলেন, “এ বার জয়ে আলিপুরদুয়ারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। পাঁচে পাঁচ করতে হবে। আলিপুরদুয়ারের প্রতিদানের সময় এ বার। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে আনম্যাপ করে দিন।”

অভিষেক দাবি করেন, “এ বার আলিপুরদুয়ারকে কথা দিতে হবে। সাড়ে চারশো বুথেই তৃণমূলকে জেতাতে হবে। একটা বুথও ছাড়লে চলবে না। বাংলায় লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল বিজেপি। এখানেই ওদের নেত্রী এই কাজ করেছিলেন। তাঁকে এখনও শাস্তি দেয়নি।”

শুধু বক্তৃতা নয়, জনতার অভিযোগও শুনলেন অভিষেক। সভায় উপস্থিত অনেকে লিখিতভাবে সমস্যা জানালে তিনি তা পড়ে সমাধানের আশ্বাস দেন। অভিষেক বলেন, “একতরফা বলে চলে যাব না। আপনারা প্রশ্ন করুন। আমি সীমিত সময়ের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করব।”

চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পাট্টা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েও আশ্বাস দেন তিনি। বলেন, “আর একটু সবুর করুন। সরকার বলেছে যখন করবেই।”

চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, “২০১১ সালে আমাদের সরকার তৈরি হওয়ার পরে ৬৭ টাকা ছিল চা-শ্রমিকের দৈনিক পারিশ্রমিক। গত ১৪ বছরে বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। গত বছর যখন এসেছিলাম, ২৫০ টাকা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, এই টাকায় সংসার চলে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে। আড়াইশো টাকা যথেষ্ট নয়। আমি কথা দিচ্ছি, চতুর্থ বার দিদির সরকার হলে আমার প্রথম দৃষ্টি থাকবে আলিপুরদুয়ার। বৈঠক করব এখানে। ৩০০ টাকা দৈনিক পারিশ্রমিক হবে, এটা সুনিশ্চিত করব।”

আলিপুরদুয়ারে জনসভায় স্পষ্ট টার্গেট বেঁধে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আলিপুরদুয়ারে পাঁচে পাঁচ করতে হবে। আলিপুরদুয়ারের প্রতিদানের সময় ছাব্বিশের নির্বাচন।”

এদিনের সভার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘জনসংযোগ’ পর্ব। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের পাঠানো চিরকুটের মাধ্যমে আসা প্রশ্নের উত্তর দেন অভিষেক। প্রবাসী শ্রমিকের ভোটাধিকার, চা বাগানে জমির পাট্টা না পাওয়া এবং হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাব- এমন একাধিক জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন তিনি এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।

মধু চা বাগানের শ্রমিক সুরেশ তুড়ি অভিযোগ করেন, “আমি ১৯৯৫ সাল থেকে কাজ করছি। কিন্তু এখনও জমির পাট্টা পাইনি। কোম্পানির মালিক পুরনো বাড়ি মেরামত করেন না। জমির পাট্টাও দেন না। আমরা কোম্পানির এনওসি পাইনি, জমির পাট্টাও পাইনি, আমাদের উপযুক্ত বাসস্থানও দেওয়া হচ্ছে না।”

এই অভিযোগের জবাবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, জমির পাট্টা একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাঁর বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন সরকার যত বেশি সম্ভব মানুষকে পাট্টা দেবে। সিপিএম আমলে একটি দেওয়াল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোও কঠিন ছিল। একাধিক এনওসি প্রয়োজন হত। এখনো অনেক জায়গায় এনওসি ও ব্যক্তিগত ছাড়পত্রের কারণে জমি সংক্রান্ত মামলায় সময় লাগে। কিন্তু যদি এত দিন অপেক্ষা করে থাকেন, তবে আরও একটু ধৈর্য ধরুন। সরকার আশ্বাস দিলে অবশ্যই পাট্টা পাবেন।”

অভিষেক আরও জানান, ট্রেড ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রতিটি প্রকৃত সমস্যা তুলে ধরা হবে এবং সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং যাদের সহায়তার প্রয়োজন তাদের সাহায্য করা।”

সভায় উপস্থিত এক শ্রমিক মিক নাগাসিয়া অভিযোগ করেন, বিয়ের জন্য সরকারি অনুদানের টাকা তিনি পাননি। অভিষেক মঞ্চ থেকেই প্রশ্ন করেন, “মিক নাগাসিয়া আপনার নাম? কোথায় আবেদন করেছিলেন? ডিএম অফিসে? বিয়ে হয়ে গিয়েছে আপনার?”

শ্রমিকের উত্তর আসে- হ্যাঁ, বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তখনই অভিষেক বলেন, “ওই আবেদনপত্র আমাকে পাঠান। আমি ব্যবস্থা করছি।”

এদিন তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দিল্লির কাছে বাংলা কখনও মাথা নত করবে না। আলিপুরদুয়ারের মাটি থেকে বিজেপিকে উৎখাত করার ডাক দিয়ে তিনি বলেন, “লাল মানে থামা, আর সবুজ মানে চলা। আলিপুরদুয়ারকে এবার সবুজ করতে হবে, যাতে উন্নয়নের চাকা দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে।”

 

TwitterFacebookWhatsAppEmailShare

ভিডিও

আরও পড়ুন

Decorative Ring
Maa Ashchen