‘সিন্থেটিক লবি’র দাপটে ধুঁকছে বাংলার জুটমিল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নালিশ তৃণমূলের
নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৭:৩০: উৎসবের মরসুমেও স্বস্তিতে নেই রাজ্যের জুটমিল। নতুন বছরের প্রথম দিনেই বাংলার পাটশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। ১ জানুয়ারি, রাজ্যের পাটশিল্পে আসন্ন সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহকে (Giriraj Singh) চিঠি লিখলেন রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ তথা INTTUC-র রাজ্য সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)। দু’পাতার ওই চিঠিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সমস্যার কথা জানানোর পাশাপাশি সমাধানের বেশ কিছু পথও বাতলে দিয়েছেন তিনি।
সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে পাটের বস্তার বরাত বা ‘অর্ডার’ ক্রমশ কমে যাওয়ার ফলেই উৎপাদনের গতি শ্লথ করতে বাধ্য হচ্ছে পাটকলগুলি। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে গঙ্গার দু’পারে হাওড়া, হুগলি ও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অর্থনীতিতে। কোথাও মিলের গেটে ঝুলছে ‘সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক’-এর নোটিস, আবার কোথাও কর্মদিবস কমিয়ে সপ্তাহে পাঁচ বা ছয় দিন করে দেওয়া হচ্ছে। হাওড়ার বালি জুটমিল-সহ হুগলির একাধিক কারখানায় ইতিমধ্যেই কর্মদিবস ছাঁটাই করা হয়েছে। অন্যদিকে, চাঁপদানির নর্থব্রুক জুটমিল বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক অরিন্দম গুঁইনের হস্তক্ষেপে আগামী সোমবার থেকে তা খোলার কথা থাকলেও, সপ্তাহে কত দিন কাজ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। পরিস্থিতি কতটা গুরুতর, তা বোঝা যায় ভদ্রেশ্বরের অ্যাঙ্গাস জুটমিলের ঘটনায়। বৃহস্পতিবার যখন ঋতব্রতের চিঠি মন্ত্রকে পৌঁছচ্ছে, ঠিক তখনই সেখানে কর্মদিবস কমানো নিয়ে জরুরি বৈঠক চলছে।
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, এই সঙ্কটের নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী ‘সিন্থেটিক লবি’। বর্তমানে অধিকাংশ পাটকলই টিকে রয়েছে কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বস্তার বরাতের ওপর। অভিযোগ, বিজেপি-শাসিত গুজরাত ও মহারাষ্ট্র থেকে নিয়ন্ত্রিত সিন্থেটিক লবির চাপে কেন্দ্রীয় সরকার পাটের বস্তার বরাত বন্ধ বা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে উৎপাদিত মাল গুদামে জমছে এবং নতুন উৎপাদনের জায়গা কমছে। তৃণমূলের আশঙ্কা, অবিলম্বে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে খুব শীঘ্রই লাইন দিয়ে পাটকলগুলি বন্ধ হতে শুরু করবে।
পাটশিল্পের (jute industry) এই সঙ্কট কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমীকরণও। জুটমিল এলাকাগুলিতে মূলত হিন্দিভাষী মানুষের বাস, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের শ্রমিকরাই কাজ করেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জরুরি অবস্থা’ বলে উল্লেখ করেছেন। শাসকদলের আশঙ্কা, লোকসভা নির্বাচনের আগে মিল বন্ধ হলে শ্রমিক অসন্তোষ থেকে আইনশৃঙ্খলার বড়সড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি, মিলের সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলার পাটচাষিদের ওপরেও।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই ধুঁকছে রাজ্যের একসময়ের গর্বের এই শিল্প। বর্তমানে অধিকাংশ মিলেই ঠিকাদারি প্রথায় কাজ চলে, স্থায়ী কাজ নেই বললেই চলে। এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার বা ‘গোদের’ ওপর বর্তমান পরিস্থিতি ‘বিষফোড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও উদ্ভূত এই সঙ্কটের মোকাবিলায় রাজ্য শ্রম দপ্তরের ভূমিকা ও তৎপরতা নিয়েও তৃণমূলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে, ২০২৫-এর শুরুতেই বড়সড় পরীক্ষার মুখে বাংলার পাটশিল্প।