প্রসবের দিনই শুনানিতে ডাক, ৪০ কিমি পাড়ি দিতে হবে পক্ষাঘাতগ্রস্তকেও! কমিশনের নির্দেশে হুলস্থুল কান্দিতে
নিউজ ডেস্ক, দৃষ্টিভঙ্গি, ১৬:৩০: একদিকে চিকিৎসকের দেওয়া প্রসবের সম্ভাব্য দিন, আর ঠিক সেই দিনই নির্বাচন কমিশনের এসআইআর (SIR) শুনানিতে হাজিরার নির্দেশ। সন্তান জন্ম দেওয়া নাকি ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখা, কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবেন, তা ভেবেই কূল পাচ্ছেন না মুর্শিদাবাদের কান্দি পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পুতুল দাস ও তাঁর পরিবার। শুধু পুতুল দেবীই নন, কমিশনের এই ‘পরিকল্পনাহীন’ নির্দেশের জেরে চরম বিপাকে পড়েছেন কান্দি ব্লকের মহালন্দি পঞ্চায়েতের ৭১ বছর বয়সী পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধাও। তবে প্রশাসনের এই কড়া নিয়মের মাঝে মানবিক উদ্যোগ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক ও পুর-কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) পাঠানো নোটিসকে কেন্দ্র করে। কান্দি পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাপন দাসের স্ত্রী পুতুল দাস পূর্ণগর্ভা। তাঁকে বৃহস্পতিবার শুনানিকেন্দ্রে তলব করা হয়েছিল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেতে পারেননি। পরবর্তী তারিখ দেওয়া হয়েছে আগামী মঙ্গলবার। ঘটনাচক্রে, চিকিৎসকের মতে ওই দিনই পুতুল দেবীর সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ (Delivery Date)।
স্ত্রীকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় বাপন বাবু বলেন, ‘‘চিকিৎসক ওকে হাসিখুশি থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু নোটিস আসার পর থেকে তো সকলের মুখ থেকে হাসি উবে গিয়েছে। এমন শারীরিক অবস্থা নিয়ে কী ভাবে শুনানিকেন্দ্রে যাবে ও? আর না গেলে তখন কী হবে, এই দুর্ভাবনায় পাগল হয়ে যেতে বসেছি।’’ অন্তঃসত্ত্বা পুতুল দেবীরও আর্তনাদ, ‘‘এই অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব। কী হবে সত্যিই জানি না।’’
অন্যদিকে, কান্দি ব্লকের মহালন্দি পঞ্চায়েতের বাসিন্দা ৭১ বছরের মাকসুরা বিবির অবস্থা আরও করুণ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং শয্যাশায়ী। অথচ তাঁকেও শুক্রবার প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের শুনানিকেন্দ্রে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশ ঘিরে দুই পরিবারের মধ্যেই তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বিষয়টি নজরে আসতেই কমিশনের বিরুদ্ধে পরিকল্পনাহীনতার অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় তৃণমূল (TMC) নেতৃত্ব। প্রশাসনের এই ‘অনমনীয় নিয়ম’-এর জেরে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কান্দির তৃণমূল বিধায়ক অপূর্ব সরকার। তবে খবর পেয়েই দুই পরিবারের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন তিনি এবং কান্দি পুরসভার চেয়ারম্যান জয়দেব ঘটক।
জানা গিয়েছে, দুই নাগরিককে শুনানিকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরসভা ও বিধায়কের উদ্যোগে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুক্রবার অ্যাম্বুল্যান্সে করে মাকসুরা বিবিকে শুনানিকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, আগামী মঙ্গলবার পুতুল দাসের জন্যও থাকছে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা।
বিধায়ক অপূর্ব সরকার বলেন, “চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। চেষ্টা করা হচ্ছে, মঙ্গলবার দুপুরের আগেই শুনানির কাজ মিটিয়ে নিতে। তার পরেই যাতে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া যায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে অ্যাম্বুল্যান্স তৈরি রাখা হবে।” পুরসভার চেয়ারম্যান জয়দেব ঘটক নিশ্চিত করেছেন যে, এই পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। প্রশাসনের জটিল নিয়মের ফোঁকরে যখন সাধারণ মানুষ দিশাহারা, তখন জনপ্রতিনিধিদের এই উদ্যোগে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে দুই পরিবার।